সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে রাঙ্গামাটিতে জেলা পুলিশের ফুটবল উৎসব

রাঙ্গামাটিতে জেলা পুলিশের ফুটবল উৎসব

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি। পর্যটন সংবাদ : রাঙ্গামাটির পাহাড়ি জনপদ রবিবার (২ নভেম্বর) পরিণত হয়েছিল উৎসবের শহরে। মাঠজুড়ে ছিল উচ্ছ্বাস, দর্শকসারিতে তরঙ্গিত আবেগ আর মুখে মুখে একটাই সুর—সম্প্রীতির জয়গান। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা ছড়িয়ে দিতে রাঙ্গামাটি জেলা পুলিশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘সম্প্রীতি ফুটবল ম্যাচ–২০২৫’।

দিনব্যাপী এই আয়োজনে স্থানীয় শিক্ষার্থী, ক্রীড়াপ্রেমী ও সাধারণ মানুষ একত্রিত হন এক মানবিক বন্ধনে। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় রাঙ্গামাটি মারি স্টেডিয়ামে, যেখানে চূড়ান্ত লড়াইয়ে মুখোমুখি হয় রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও রানী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয়।

ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশের অনুপ্রেরণামূলক বার্তা

ট্রফি বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মোঃ আহসান হাবীব পলাশ, বিপিএম–সেবা (অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত)। স্টেডিয়ামে পৌঁছালে পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডিআইজি আহসান হাবীব বলেন, খেলাধুলা কেবল প্রতিযোগিতা নয়—এটি সমাজে শৃঙ্খলা, ন্যায়বোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতার চেতনা জাগায়। তাঁর ভাষায়, “রাঙ্গামাটি জেলা পুলিশের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, পুলিশ কেবল আইনশৃঙ্খলার রক্ষক নয়, তারা জনগণের বন্ধু ও শান্তির অগ্রদূত।”

তিনি আরও বলেন, পাহাড়ের এই অঞ্চলে বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মানুষ বহুদিন ধরে একসাথে বসবাস করছে। সেই সামাজিক সম্প্রীতি ধরে রাখতে এমন আয়োজন প্রয়োজনীয়ই নয়, বরং সময়ের দাবি। “খেলাধুলার মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি হয়, দূরত্ব ঘোচে, আর জন্ম নেয় একতার শক্তি”—বললেন ডিআইজি পলাশ।

পুলিশ সুপার ড. ফরহাদ হোসেনের বক্তব্য

সভাপতির আসনে ছিলেন রাঙ্গামাটি জেলা পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন। তিনি বলেন, রাঙ্গামাটি জেলা পুলিশ সবসময় শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পক্ষে কাজ করছে। পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সামাজিক বন্ধন আরও শক্ত করতে এই আয়োজন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তাঁর মতে, খেলাধুলা এমন এক প্ল্যাটফর্ম যেখানে সবাই সমানভাবে অংশ নিতে পারে—ধর্ম, বর্ণ, জাতি কোনো ব্যাপার নয়। এ কারণেই সম্প্রীতি ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি মানুষের মধ্যে বিশ্বাস, সৌহার্দ্য ও মানবিক সম্পর্কের প্রতীক।

ফাইনালে নাটকীয় জয় রানী দয়াময়ীর

দিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মুহূর্ত ছিল ফাইনাল ম্যাচ। দুই দলই শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক খেলে দর্শকদের মুগ্ধ করে। রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও রানী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্যকার নির্ধারিত সময়ের খেলায় গোল না হওয়ায় ম্যাচটি গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে রানী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয় ৪–২ গোলের ব্যবধানে জিতে নেয় শিরোপা।

গোলকিপারের দুর্দান্ত সেভ এবং দর্শকদের উচ্ছ্বাস মিলে স্টেডিয়াম তখন যেন ছোট এক কার্নিভালে পরিণত হয়। ম্যাচ শেষে অতিথিবৃন্দ বিজয়ী ও রানার্স-আপ দলের খেলোয়াড়দের হাতে ট্রফি ও পুরস্কার তুলে দেন।

সম্মানিত অতিথিদের উপস্থিতি

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (হেডকোয়ার্টার্স) ফরিদা ইয়াসমিন, রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ, ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার কাজী নুসরাত এদীব লুনা, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সরিৎ কুমার চাকমা, জেলা পরিষদ সদস্য বরুণ বিকাশ দেওয়ান এবং জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদ।

তাঁরা সবাই একবাক্যে বলেন, সম্প্রীতি রক্ষার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম খেলাধুলা। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচক পথে রাখার ক্ষেত্রে এমন আয়োজন অনুকরণীয় উদাহরণ হতে পারে।

ঐক্যের প্রতীক এই আয়োজন

পুরো মাঠজুড়ে ছিল একতা ও ভ্রাতৃত্বের আবহ। পুলিশের কর্মকর্তারা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, ক্রীড়াবিদ, শিক্ষক–শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষ—সবাই অংশ নেন আনন্দমুখর এই উৎসবে। রাঙ্গামাটির মতো পাহাড়ি এলাকায় যেখানে নানা জাতিগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির সহাবস্থান, সেখানে এ ধরনের আয়োজন সম্প্রীতির সেতুবন্ধন আরও মজবুত করবে—এমনটাই বলছেন উপস্থিত দর্শকরা।

দিনের শেষে জয় পরাজয় ভুলে সবাই মেতে ওঠে আনন্দে। কারণ এই ফুটবল ম্যাচের মূল জয় তো সম্প্রীতির।রাংগ

Read Previous

বঙ্গোপসাগরে নতুন লঘুচাপ, বৃষ্টি বাড়ার আভাস দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে

Read Next

আর্জেন্টিনার পুয়ের্তো মাদেরো: আধুনিকতার ছোঁয়ায় নদীঘেরা শহরের এক অনন্য রূপ

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular