১১/০৫/২০২৬
২৮শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শ্রীলঙ্কার পর্যটন খাতে নতুন উত্থান: ২০২৬ সালে দ্বীপরাষ্ট্রের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন

ফাইল ছবি

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : শ্রীলঙ্কা ২০২৬ সালের শুরুতেই তার পর্যটন শিল্পে এক অসাধারণ পুনরুজ্জীবনের সাক্ষী হচ্ছে। ট্র্যাভেল অ্যান্ড ট্যুর ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদন অনুসারে, আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সংখ্যা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দীর্ঘ উত্থান-পতনের পরও এই ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপটি তার অনন্য আকর্ষণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ভ্রমণপিপাসুদের মন জয় করে চলেছে। সমুদ্র, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও বন্যপ্রাণীর অপূর্ব মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা শ্রীলঙ্কা এখন আর শুধু একটি গন্তব্য নয়, বরং একটি পুনরুদ্ধারের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

দেশটির দক্ষিণ উপকূল পর্যটকদের জন্য স্বপ্নের মতো। মিরিসা, উনাওয়াতুনা ও হিক্কাডুয়ার সোনালি বালুকাময় সৈকত, স্বচ্ছ নীল জলরাশি এবং প্রাণবন্ত সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য যেকোনো সমুদ্রপ্রেমীকে মুগ্ধ করবে। সার্ফিং উৎসাহীদের জন্য আরুগাম বে ও ওয়েলিগামা বে-এর ঢেউয়ের আহ্বান অপ্রতিরোধ্য। এই উপকূলীয় অঞ্চলগুলো শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই নয়, ঐতিহাসিক গভীরতাও যোগ করে। গল শহরের ইউনেস্কো স্বীকৃত গল দুর্গ তার নুড়ি পাথরের রাস্তা, ঔপনিবেশিক স্থাপত্য ও জমজমাট বাজারের মাধ্যমে দেশটির বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক অতীতকে জীবন্ত করে তোলে। পর্যটকরা এখানে সমুদ্রের বাতাসে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের স্পর্শ অনুভব করতে পারেন।

উপকূল যেমন পর্যটকদের আকর্ষণ করে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাদেরকে দীর্ঘদিন ধরে রাখে। দাম্বুলার কাছে অবস্থিত সিগিরিয়া বা সিংহ শিলা ১৯৮২ সাল থেকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। ২০০ মিটারেরও বেশি উঁচু এই বিশাল শিলায় অবস্থিত প্রাচীন প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ, অসাধারণ ম্যুরাল ও জল-উদ্যান প্রাচীন রাজকীয় গৌরবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অন্যদিকে ক্যান্ডির দাঁতের মন্দির (শ্রী দলদা মালিগাওয়া) বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র তীর্থস্থান। এখানে রক্ষিত বুদ্ধের দাঁতের অবশেষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আধ্যাত্মিক পরিবেশ শ্রীলঙ্কার ধর্মীয় গভীরতা প্রকাশ করে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর অনুরাধাপুরার প্রাচীন স্তূপ, মঠ ও বিশাল জলাধারগুলো দেশের হাজার বছরের বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে।

শ্রীলঙ্কার প্রাকৃতিক সম্পদও কম আকর্ষণীয় নয়। ইয়ালা জাতীয় উদ্যান এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় সাফারি গন্তব্য, যেখানে চিতাবাঘ, হাতি ও নানা প্রজাতির পাখি দেখা যায়। উদাওয়ালাওয়ে জাতীয় উদ্যানে বিপুল সংখ্যক এশীয় হাতির দেখা মেলে, আর হর্টন প্লেইন্সের মনোরম পাহাড়ি দৃশ্য ও ‘এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ খাদ ট্রেকিংপ্রেমীদের স্বর্গরাজ্য। এসব স্থান শ্রীলঙ্কাকে শুধু সমুদ্র ও সংস্কৃতির দেশ নয়, বরং বন্যপ্রাণী ও অ্যাডভেঞ্চারেরও আদর্শ গন্তব্য করে তুলেছে।

২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে এই উত্থানের সংখ্যাগত প্রমাণ স্পষ্ট। শ্রীলঙ্কা পর্যটন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এসএলটিডিএ)-এর ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন অনুসারে, ফেব্রুয়ারি মাসে ২৭৯,৩২৮ জন আন্তর্জাতিক পর্যটক এসেছেন, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মাসিক সংখ্যা। এটি ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর তুলনায় ১৬.২ শতাংশ এবং ২০১৮ সালের তুলনায় ১৮.৫ শতাংশ বেশি। জানুয়ারিতে এসেছিলেন ২৭৭,৩২৭ জন, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৯.৭ শতাংশ বেশি। ফলে প্রথম দুই মাসে মোট পর্যটকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫৬,৬৫৫ জনে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ১২.৯ শতাংশ বৃদ্ধি।

এই প্রবৃদ্ধি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। কোভিড-১৯ মহামারী, ২০২২ সালের তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক অস্থিরতা এবং ২০২৫ সালের ঘূর্ণিঝড় দিতওয়াহ-এর মতো প্রতিকূলতার পরও শ্রীলঙ্কা তার পর্যটন খাতকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। সরকারি উদ্যোগগুলো এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, আবাসনের মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বৃদ্ধি, ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং লক্ষ্যভিত্তিক প্রচারণা দেশটিকে নতুন করে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

টেকসই পর্যটনের দিকে জোর দেওয়া হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ইকো-ট্যুরিজম, ওয়েলনেস ট্যুরিজম, হেরিটেজ ট্যুরিজম এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটনের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কা দায়িত্বশীল ভ্রমণের একটি মডেল হয়ে উঠছে। প্রকৃতি সংরক্ষণ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সুরক্ষার সঙ্গে অর্থনৈতিক লাভকে যুক্ত করে দেশটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথে হাঁটছে। ২০২৫ সালে রেকর্ড ২.৩৬ মিলিয়ন পর্যটক এবং ৩.২ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব অর্জনের পর ২০২৬ সালে তিন মিলিয়ন পর্যটকের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি শুধু সংখ্যায় নয়, গুণগত মানেও পরিবর্তন আনছে। পর্যটকদের অবস্থানকাল বাড়ছে, গড় ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোতে চাপ কমছে।

শ্রীলঙ্কার এই প্রত্যাবর্তন তার জনগণের স্থিতিস্থাপকতা ও সরকারের দূরদর্শী পরিকল্পনার ফল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক সংকট ও মহামারীর মতো চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দেশটি তার অনন্য ভূদৃশ্য, সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও উষ্ণ অতিথিপরায়ণতার ওপর ভর করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আগামী বছরগুলোতে যদি এই গতিকে টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে শ্রীলঙ্কা দায়িত্বশীল পর্যটনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠবে। যারা খাঁটি অভিজ্ঞতা, প্রকৃতির সান্নিধ্য ও সাংস্কৃতিক গভীরতা খুঁজছেন, তাদের জন্য এই দ্বীপরাষ্ট্র এখন বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য।

শ্রীলঙ্কার বর্তমান উত্থান প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা, প্রকৃতির সুরক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে যেকোনো দেশ সংকট থেকে উঠে আসতে পারে। ২০২৬ সাল শ্রীলঙ্কার জন্য শুধু পর্যটনের বছর নয়, বরং এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের বছর।

/এএইচকে

Read Previous

মাতৃ দিবসে ঢাকায় উদ্ভাবনী ‘মাদার্স মার্কেট’ উদ্বোধন, মাতৃত্ব ও উদ্যোগশীলতাকে একমঞ্চে আনল ব্র্যাক ব্যাংক তারা

Read Next

শেনজেন ভিসা থাকলেও প্রবেশের নিশ্চয়তা নেই: ঢাকায় যৌথ সতর্কতা জারি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular