
ছবি : সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিনিধি। পর্যটন সংবাদ : মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়ন এখন নতুন এক সৌন্দর্যের ঠিকানা। বিস্তীর্ণ হাইল হাওড়জুড়ে লাল শাপলার দিগন্তজোড়া বিস্তার যেন পুরো জায়গাটাকে বদলে দিয়েছে। মানুষ নিজের চোখে এই দৃশ্য দেখার লোভ সামলাতে পারছে না। দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই পর্যটকরা এসে ভরে তুলছেন ‘লাল শাপলা বিল’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠা এই হাওড়ের চারপাশ।
হাইল হাওড়ের শাপলা বছরের নানা সময়েই দেখা যায়, কিন্তু ভোরের আলোতে যে দৃশ্যটা ফুটে ওঠে, সেটাই আসল আকর্ষণ। প্রথম সূর্যের আলো যখন পানির গায়ে পড়ে আর হাজার হাজার লাল শাপলা একসাথে মাথা তোলে, তখন পুরো হাওড় যেন এক রঙিন চাদরে ঢেকে যায়। সেই মুহূর্তটা চোখে একবার দেখলে ভুলে থাকা কঠিন। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুলগুলো আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে। দুপুরে কিছুটা নীরব হলেও বিকেলের আলোয় আবার প্রাণ ফিরে পায়। দিনের বিভিন্ন সময়ে প্রকৃতির এই বদলে যাওয়া রূপই দর্শনার্থীদের কাছে জায়গাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে।
এই শাপলার সৌন্দর্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দর্শনার্থীর ভিড় কয়েকগুণ বেড়েছে। অনেকেই জানতেন না মির্জাপুরে এমন এক হাওড় আছে। এখন যেদিনই সেখানে যাওয়া হয়, দেখা যায় নামতে না নামতেই মানুষ ছবি তুলছে, নৌকায় করে বিলের ভেতরে যাচ্ছে, আবার কেউ দূর থেকে পুরো এলাকা দেখছে। জায়গাটি বাণিজ্যিকভাবে এখনো খুব বেশি সাজানো নয়, তবুও কাঁচা সৌন্দর্যের টানেই মানুষ ছুটে আসছে।
কলেজছাত্রী দিবান্বিতা দাশগুপ্তা প্রথমবার এখানে এসে ঠিক কী অনুভব করেছিলেন, সেটা তার কথাতেই স্পষ্ট। তিনি বললেন, আগে এত বিশাল লাল শাপলার সমাহার কখনো দেখেননি। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে এসে যেন নতুন কোনো পৃথিবীর দেখা পাচ্ছেন। তাদের মতো আরও অনেক তরুণ-তরুণী এখানে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিচ্ছেন প্রকৃতির মাঝেই।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন দর্শনার্থী ফাহিম আহমদ। তার মতে, আগে এই জায়গায় খুব কম লোকই আসত। এখন পরিস্থিতি একেবারে বদলে গেছে। যারা একটু শান্ত, নিরিবিলি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত জায়গা খুঁজছেন, তাদের জন্য লাল শাপলা বিল এখন বড় আকর্ষণ। তিনি আরও বললেন, এখানে শুধু শাপলাই নয়; আশপাশের পাখিগুলোর ডাক, পানির শব্দ, বাতাসের গুঞ্জন—সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশটা আলাদা এক অনুভূতি তৈরি করে।
আরেক দর্শনার্থী আরোফিন হোসেন বহুদিন ধরে লাল শাপলা দেখার ইচ্ছে পুষে রেখেছিলেন। অবশেষে সুযোগ পেয়েছেন, আর সেটাও পরিবার নিয়ে। ভোরের আলোয় ফুটে থাকা শাপলার দিকে তাকিয়ে থাকা, চারপাশে পাখির ডাক, বাতাসের ভেজা গন্ধ—এসব মিলিয়ে তাকে মুগ্ধ করেছে। অনেকেই বলছেন, জায়গাটার বিশেষত্বই হলো এর স্বাভাবিক, অনাড়ম্বর সৌন্দর্য। এখানে এসে মানুষ যেমন ছবি তুলতে ব্যস্ত, তেমনি অনেকেই শান্তভাবে বসে থেকে বিলের দিকে তাকিয়ে সময় কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় প্রশাসনও পুরো বিষয়টি নজরে রেখেছে। ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঠিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসলাম উদ্দিন জানিয়েছেন, মির্জাপুরের লাল শাপলা এখন শুধু স্থানীয়দের নয়, দেশের বাইরের মানুষেরও দৃষ্টি কেড়েছে। প্রতিদিন যেভাবে লোকসমাগম বাড়ছে, তাতে স্থানটি দ্রুতই একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন এলাকায় রূপ নিতে পারে। তিনি জানিয়েছেন, পর্যটকদের সুবিধা নিশ্চিত করতে কয়েকটি উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছে—নিরাপদ নৌকা ব্যবস্থা, যাতায়াত সহজ করা, তথ্যকেন্দ্র তৈরি, এমনকি পরিবেশ রক্ষার পরিকল্পনাও এর মধ্যে আছে।
মির্জাপুরের লাল শাপলা বিল এমন এক জায়গা, যেখানে প্রকৃতি নিজের মতো করে সাজিয়েছে। এখানে বিজ্ঞাপনী সাজসজ্জা নেই, বড় রিসোর্ট নেই, ঝলমলে আলোর ঝাঁক নেই। আছে কেবল জল, আলো, বাতাস আর লাল ফুলের বাহার। যারা একটু অন্যরকম অভিজ্ঞতা খুঁজছেন, শ্রীমঙ্গলের চায়ের বাগান ঘুরে আরও কিছু দেখতে চান—তাদের জন্য হাইল হাওড়ের এই অংশটা এখন দারুণ একটি সংযোজন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মির্জাপুরের লাল শাপলা বিল বাংলাদেশের নতুন প্রাকৃতিক আকর্ষণ হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আর মানুষ যত আসছে, ততই ছড়িয়ে পড়ছে এই হাওড়ের গল্প—এক হাওড় যেখানে ভোরে ফুটে ওঠা লাল ফুল যেন প্রকৃতিকে নতুন করে সাজিয়ে দেয়।
প্রতিবেদক : আবীর খান



