
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বিশ্ব মা দিবস, প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারে উদযাপিত এই পবিত্র দিনটি শুধু ফুল, কার্ড বা উপহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আজকের ভ্রমণপ্রিয় প্রজন্ম এই দিনকে মায়েদের সঙ্গে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি গড়ার সোনালি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করছে। ২০২৬ সালের ১০ মে বিশ্বজুড়ে হাজারো পরিবার মায়েদের হাত ধরে বেরিয়ে পড়েছে দূর দূরান্তের পথে। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সম্মোহন, বিলাসবহুল বিশ্রাম কিংবা অ্যাডভেঞ্চারের রোমাঞ্চ—সবকিছু মিলিয়ে এই ভ্রমণগুলো হয়ে উঠছে মা-সন্তানের হৃদয়ের গভীরতম বন্ধনের প্রতীক। এই বিশেষ দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণপ্রিয় পর্যটকরা কীভাবে মায়েদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, তা আজ জেনে নেয়া যাক।
যুক্তরাষ্ট্রে মা দিবসের ভ্রমণ সবসময়ই অনন্য আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের অপার্থিব সৌন্দর্যে মায়েরা গিজারের উষ্ণ জলের ফোয়ারা, বিশাল জলপ্রপাত আর বন্যপ্রাণীর মায়াবী খেলা দেখে মুগ্ধ হন। আরভি ক্যাম্পিংয়ের মাধ্যমে পরিবারগুলো তারার নিচে রাত কাটিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি চলে যান। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের লাল-কমলা পাথুরে প্রান্তরে সূর্যাস্তের অসাধারণ দৃশ্য, হেলিকপ্টার ট্যুর কিংবা হাইকিং—এসব অভিজ্ঞতা মায়েদের চোখে আনন্দের ঝিলিক তুলে দেয়। ক্যালিফোর্নিয়ার নাপা ভ্যালিতে ওয়াইন টেস্টিং, সেডোনার রেড রকসে আধ্যাত্মিক হাইকিং, হাওয়াইয়ের মাউই বা ওয়াহুর সোনালি সৈকতে বিচ রিল্যাক্সেশন—এগুলো আধুনিক মায়েদের প্রিয় গন্তব্য। নিউইয়র্কের ব্রডওয়ে শো, সেন্ট্রাল পার্কের পিকনিক, চার্লসটন বা সাভানার দক্ষিণী ঐতিহ্যবাহী সৌন্দর্যও এবার ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
ইউরোপ মা দিবসের ভ্রমণকে করে তোলে আরও রোমান্টিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ। ফ্রান্সের প্যারিসে মায়েরা ল্যুভর মিউজিয়ামে মোনালিসার রহস্যময় হাসি দেখেন, আইফেল টাওয়ারের পাদদেশে হাঁটেন, সিন নদীর ক্রুজে বসে সুস্বাদু কফি ও ক্রোয়াসাঁ উপভোগ করেন। প্যারিসের ছোট ছোট ক্যাফে ও রেস্তোরাঁয় ফরাসি খাবারের স্বাদ নিয়ে অনেকে বলেন, “এটিই মায়ের জন্য সেরা উপহার।” ইতালির রোমে প্রাচীন ইতিহাসের মাঝে হাঁটা, গ্রিসের সান্তোরিনির সাদা-নীল ঘরের মাঝে সূর্যাস্ত দেখা, মাইকোনোসের সৈকতে মা-মেয়ের বন্ডিং—এসব মুহূর্ত হৃদয়ে চিরকালের জন্য গেঁথে যায়। স্পেনের সোনালি সৈকত, ডাবলিনের শপিং ও পাব কালচার, লন্ডনের থিয়েটার ও আফটারনুন টি মায়েদের মুখে ফুটিয়ে তোলে অপূর্ব হাসি। ২০২৬ সালে মা-মেয়ে ট্রিপের জন্য ইতালি, গ্রিস ও পর্তুগাল বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
এশিয়া মা দিবসের উদযাপনে নিয়ে আসে শান্তি, আধ্যাত্মিকতা ও প্রাণবন্ত সংস্কৃতির মিশ্রণ। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে মন্দির দর্শনের পর ফুকেট বা কোহ সামুইয়ের শান্ত সৈকতে স্পা ট্রিটমেন্ট নিয়ে মায়েরা পুনর্জীবিত বোধ করেন। জাপানের কিয়োটোতে ঐতিহ্যবাহী মন্দির, সুন্দর গার্ডেন ও ট্র্যাডিশনাল চা সেরেমনি মায়েদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। ভারত ও বাংলাদেশের পর্যটকরা এ সময় কাশ্মীরের সবুজ উপত্যকা, দার্জিলিংয়ের চা বাগান, কেরালার ব্যাকওয়াটার, গোয়ার সৈকত কিংবা উদয়পুরের রাজকীয় প্রাসাদে মায়েদের নিয়ে যান। বাংলাদেশে কক্সবাজারের ঢেউয়ের গর্জন, সিলেটের সবুজ চা বাগান, সাজেক ভ্যালির মেঘের সমুদ্র, সুন্দরবনের রহস্যময় ম্যানগ্রোভ কিংবা রাঙামাটি-বান্দরবানের পাহাড়ি সৌন্দর্য মা দিবসের ভ্রমণকে করে তোলে দেশীয় আবেগে ভরপুর।
ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে ভ্রমণ মানে বিলাসবহুল বিশ্রামের উৎসব। আরুবা, সেন্ট লুসিয়া বা ডোমিনিকান রিপাবলিকের তুর্কোয়াজ নীল সমুদ্রের তীরে স্পা, স্নরকেলিং, সানসেট ডিনার ও প্রাইভেট বিচ ওয়াক মায়েদের জন্য স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা। ফিজি বা বাহামাসের প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলে ডুব দিয়ে পর্যটকরা বলছেন, “এখানে এসে মা সত্যিই রিচার্জড হয়েছেন।” আফ্রিকার জানজিবারে স্পাইস ট্যুর ও সাদা বালুর সৈকতও অনেকের পছন্দের তালিকায় রয়েছে।
২০২৬ সালের ট্রেন্ড অনুসারে মাল্টি-জেনারেশনাল ট্রিপ, স্লো ট্রাভেল, কোয়েটকেশন এবং ওয়েলনেস রিট্রিটের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। নেদারল্যান্ডসের টিউলিপ ফিল্ড, কানাডার ব্যানফ ন্যাশনাল পার্ক, চিলির স্টারগেজিং স্পট কিংবা স্লোভেনিয়ার অ্যাডভেঞ্চার ট্রেইল মা-মেয়ে বা পুরো পরিবারের জন্য আদর্শ। অনেক ওয়েলনেস রিসোর্টে ইয়োগা, মেডিটেশন, স্পা ট্রিটমেন্ট ও বিশেষ মা দিবস প্যাকেজের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ক্রুজ শিপ বা প্রাইভেট আইল্যান্ড রিসোর্ট বেছে নিয়ে লাক্সারি ট্রাভেলাররা মেডিটারেনিয়ানের গ্রিস-ইতালি-স্পেন ঘুরে অসাধারণ স্মৃতি সংগ্রহ করছেন।
ভ্রমণপ্রিয়দের মতে, মা দিবসের এই ভ্রমণ শুধু ছুটি নয়—এটি সম্পর্ককে আরও গভীর, আরও মজবুত করার সেতু। ফুলের বদলে অভিজ্ঞতা উপহার দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে বলে হোটেল, রিসোর্ট ও ট্যুর অপারেটরদের মা দিবস স্পেশাল প্যাকেজের চাহিদা গত বছরের তুলনায় ৩০-৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবেশবাদী পর্যটকরা সাসটেইনেবল ডেস্টিনেশন ও ন্যাশনাল পার্ক বেছে নিচ্ছেন, যেখানে প্রকৃতির সংরক্ষণের সঙ্গে মায়েদের সঙ্গে সময় কাটানো যায়।
বাংলাদেশের পর্যটকদের মধ্যেও এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। অনেকে দেশের অপরূপ স্থানগুলোতে মায়েদের নিয়ে যাচ্ছেন, আবার অনেকে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই বা ইউরোপের দিকে ঝুঁকছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা ছবি ও গল্পগুলো দেখে বোঝা যায়, এই ভ্রমণগুলো কতটা আবেগঘন ও স্মরণীয় হয়ে উঠছে।
বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে ভ্রমণপ্রিয় পর্যটকরা শুধু দেশ বা জায়গা নয়, বরং হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতা বেছে নিচ্ছেন। প্যারিসের রোমান্টিক আবহ, হাওয়াইয়ের সোনালি সৈকত, ইয়েলোস্টোনের প্রকৃতির জাদু কিংবা কক্সবাজারের ঢেউয়ের সঙ্গীত—প্রতিটি স্থানে মায়ের হাসি আর সন্তানের ভালোবাসা মিলেমিশে এক অমর চিত্র হয়ে ওঠে। এই যাত্রাগুলো শুধু ছবিতে বা স্মৃতিতে নয়, আত্মার গভীরে স্থায়ী আসন করে নেয়। মায়েরা বিশ্বের সেরা ভ্রমণসঙ্গী—তাদের জন্য এমন উপহারই সবচেয়ে মূল্যবান। আসুন, আমরাও মায়েদের হাত ধরে বেরিয়ে পড়ি কোনো না কোনো অপরূপ গন্তব্যের উদ্দেশে। কারণ মায়ের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ভ্রমণ।
প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার


