১৮/০৪/২০২৬
৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিমানবন্দরের অনিয়মের বিরুদ্ধে কড়ায়-গণ্ডায় পদক্ষেপে বেবিচক

বিমানবন্দরের অনিয়মের বিরুদ্ধে কড়ায়-গণ্ডায় পদক্ষেপে বেবিচক

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : দেশের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে ঘিরে থাকা অনিয়ম, চোরাচালান আর যাত্রী হয়রানির অভিযোগ এবার সরাসরি টেবিলে তুলেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। সংস্থাটি গত পাঁচ বছরে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক অপরাধে সম্পৃক্তদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করছে। শুধু বেবিচক নয়—বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় জড়িত অন্যান্য সংস্থার কর্মীদের বিরুদ্ধেও তথ্য সংগ্রহ চলছে। লক্ষ্য একটাই: যারা বিমানবন্দরের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা।

বেবিচক ইতোমধ্যে দেশের প্রতিটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরকে একটি করে চিঠি পাঠিয়েছে। এতে পূর্বের অভিযোগ, তদন্ত নথি, ভিডিও ফুটেজ, বিভাগীয় রিপোর্ট এবং বিগত বছরের শৃঙ্খলা ভঙ্গ সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এবার কাজটা শুধু আলোচনা বা প্রতিশ্রুতির পর্যায়ে নেই—বাস্তবে নাম শুরু করে দিয়েছে সংস্থাটি।

‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কঠোর বেবিচক

বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক কাওছার মাহমুদ জানান, সংস্থাটি এখন সম্পূর্ণ কঠোর অবস্থানে। তার কথায়, বিমানবন্দর হলো দেশের প্রথম পরিচয়, আর সেই জায়গাটিতে অনিয়মের কোনো সুযোগ রাখা হবে না। তিনি বলেন, যারা সৎভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তাদের জন্য ভাবনার কিছু নেই; কিন্তু যারা যাত্রী হয়রানি, ঘুষ লেনদেন বা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত—তাদের এবার ছাড় দেওয়া হবে না।

অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেসব বড় চোরাচালানের ঘটনা ঘটেছে, তার বেশিরভাগেই বিমানবন্দরের ভেতরের কিছু কর্মীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বেবিচকের একটি বিশেষ টিম এসব ঘটনার নথি খুঁজে দেখছে এবং পূর্বের তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও শাস্তি হয়নি, তাঁদের নামও পুনরায় যাচাই করা হচ্ছে।

প্রাথমিকভাবে ৩০ জনের নাম নিশ্চিত করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হলে সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের চিত্র

বিমানবন্দরগুলোয় নানা সময় অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও এবার তদন্তে আরও পরিষ্কারভাবে সামনে এসেছে সিন্ডিকেটের উপস্থিতি। লাগেজ হ্যান্ডলিং, কার্গো টার্মিনাল, নিরাপত্তা স্ক্যানিং, ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট—এই সবকটি স্পর্শকাতর স্থানে কিছু কর্মী দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন।

একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, আগের তদন্তগুলোতে দৃশ্যমান ফল পাওয়া যেত না। প্রমাণ ছিল অসংগত, আবার কখনো উচ্চ পর্যায়ের প্রভাবশালী মহল হস্তক্ষেপ করতেন। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ভিডিও ফুটেজ, সাক্ষ্য, নথিপত্র—সব মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে।

তদন্তে পাওয়া গেছে, কিছু কর্মকর্তা এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে বদলি হলেও তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড একইভাবে চলতে থেকেছে। কেউ কেউ আগের তদন্তেও রেহাই পেয়েছিলেন। এবার তাদের পুরোনো নথিও আবার খোলা হচ্ছে।

বিভিন্ন সংস্থার কর্মী জড়িত

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, শনাক্ত হওয়া ৩০ জনের মধ্যে রয়েছেন আর্মড ব্যাটালিয়নের সদস্য, এভিয়েশন সিকিউরিটি ফোর্সের কয়েকজন, আনসারের সদস্য, সিকিউরিটি গার্ড, কাস্টমস কর্মকর্তাসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কর্মী। কেউ এখনও দায়িত্ব পালন করছেন, কেউ আবার ইতোমধ্যে বদলি হয়ে গেছেন। কিন্তু অবস্থান পরিবর্তন করলেই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

চোরাচালানের নতুন নতুন পদ্ধতি

বিমানবন্দর-সংক্রান্ত অপরাধের জগতে সোনাচালান অন্যতম বড় সমস্যা। তদন্তে উঠে এসেছে, পাচারকারীরা নানা অভিনব কৌশল ব্যবহার করছে—পোশাকের ভেতরে সোনা গুঁড়া মিশিয়ে রাখা, জুতার সোলের ভেতর লুকানো, সাবানের কেস বা ওষুধের কৌটা ব্যবহার, এমনকি হুইলচেয়ার বা ল্যাপটপের ভেতর ফাঁকা স্থান তৈরি করে সোনা বহন করা—এসবই এখন পরিচিত কৌশল। নজর এড়াতে সোনার ওপর কালো বা সিলভার প্রলেপও ব্যবহার করছে চক্রটি।

কার্গো হাউস ও লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড শাখা—দুটো স্থানই দীর্ঘদিন ধরে নজরদারিতে ছিল। এখানে কর্মরতদের কয়েকজনের আচরণ ও যাবতীয় নথি এবার বিশেষভাবে যাচাই করা হচ্ছে। সম্প্রতি কার্গো এলাকা থেকে মোবাইল চুরি করে বের হওয়ার সময় এক আনসার সদস্যকে আটক করা হয়, যা ঘটনার গুরুত্ব আরও সামনে এনে দেয়।

কেন এখন এত কঠোরতা?

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিমানবন্দরের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসে। আন্তর্জাতিক মান অর্জন, যাত্রী সেবা উন্নয়ন এবং দেশের ভাবমূর্তি রক্ষাকে কেন্দ্র করে বেবিচক নানা পরিকল্পনা হাতে নেয়। সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অন্যতম অংশই হলো দুর্নীতির নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলা।

শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। কিন্তু একইসঙ্গে অভিযোগের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য—যাত্রী হয়রানি, লাগেজ বিলম্ব, অতিরিক্ত ঘুষ দাবি, চোরাচালান, পণ্য আটকিয়ে রাখা ইত্যাদি। দেশ-বিদেশে এসব নিয়ে সমালোচনা চলতেই থাকে।

বেবিচকের মতে, এবার আর কোনো অভিযোগ শুধু নথিতে রেখে দেওয়া হবে না। শনাক্ত প্রতিটি অভিযোগের ভিত্তিতে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পর্যটন খাতেও প্রতিফলন

বিমানবন্দরের মান শুধু ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকেই প্রভাবিত করে না—দেশের পর্যটন খাতও এর ওপর নির্ভরশীল। যাত্রী হয়রানি বা চোরাচালানের খবর বিদেশি পর্যটকের সিদ্ধান্তকে সরাসরি প্রভাবিত করে। তাই পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এবার বেবিচকের কঠোর পদক্ষেপ দেশের ভাবমূর্তি ও পর্যটন নিরাপত্তায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ

Read Previous

প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের জরুরি ঘোষণা: মেয়াদোত্তীর্ণ ও অচিরেই শেষ হতে যাওয়া পাসপোর্টধারীদের জন্য নতুন নির্দেশনা

Read Next

সুন্দরবনের গভীরে মিলল দুই বিশাল মিঠাপানির ভাণ্ডার: গবেষকদের মতে জলসংকট মোকাবিলায় খুলছে নতুন সম্ভাবনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular