
ছবি : সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অনিয়ম, মূল্য নির্ধারণে অস্বচ্ছতা আর যাত্রীদের ভোগান্তির প্রসঙ্গ আবার সামনে আনলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন।
তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানালেন, এই খাতের ব্যাপক বিশৃঙ্খলা আর অপরাধমূলক প্রবণতা আর সহ্য করা হবে না। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে যে বাস্তবতা তিনি দেখেছেন, তা তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে—এমনটাও উল্লেখ করেন তিনি।
মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর এক হোটেলে ঢাকা–জেদ্দা রুটে সৌদি আরবের নতুন স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থা ফ্লাইএডিয়ালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি পুরো খাতকে উদ্দেশ্য করে এক ধরনের সতর্কবার্তাই দেন।
তার ভাষায়, যেসব অনিয়ম এতদিন অদৃশ্য দেয়ালের আড়ালে ছিল, সেগুলো এবার বেশ স্পষ্টভাবে সামনে আসছে, আর এগুলো বন্ধে তিনি যেকোনো চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত।
বিমান ভাড়ার অস্বাভাবিকতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন
অনুষ্ঠানে তিনি বিশেষভাবে তুলে ধরেন দেশীয় রুট এবং আন্তর্জাতিক রুটে বিমান ভাড়ার অদ্ভুত পরিস্থিতি।
তার কথায়, স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থাগুলোর মূল বৈশিষ্ট্যই হলো কম দাম। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশে এই শ্রেণির এয়ারলাইনগুলো অনেক সময় লিগ্যাসি বা পূর্ণ-সেবা প্রদানকারী সংস্থার চাইতেও বেশি ভাড়া নিচ্ছে।
এ বিষয়টি তাকে অবাকই করেনি, বরং ব্যথিত করেছে—এমন মন্তব্যও করেন তিনি।
উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, কম খরচের বিমান সংস্থাগুলোর সাধারণত সেবা সীমিত থাকে; বিমানে পানি, খাবার কিছুই বিনামূল্যে দেওয়া হয় না। প্রয়োজন হলে মূল্য দিয়ে নিতে হয়।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে—এই অতিরিক্ত ভাড়ার পেছনে প্রকৃত কারণ কী? কারা এই অতিরিক্ত অর্থ নিচ্ছে?
উপদেষ্টার বক্তব্য, এই অর্থ প্রবাহ অনুসরণ করে সমস্যার মূলস্থানে পৌঁছাতেই তিনি এখন কাজ শুরু করেছেন।
বিমানবন্দরের ওপর অতিরিক্ত চাপ ও কাঠামোগত দুর্বলতা
দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির ধারণক্ষমতা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী টার্মিনালটির বার্ষিক ধারণক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ যাত্রী, অথচ বাস্তবে এখানে যাতায়াত করছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ।
এই চাপ শুধু যাত্রীসেবা নয়, সামগ্রিক অপারেশন ও নিরাপত্তাকেও কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলে দিচ্ছে।
নতুন টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো হলে বাজারে প্রতিযোগিতা শক্তিশালী হবে।
এর ফলে ভাড়া স্থিতিশীল হবে এবং অস্থিরতা কমে আসবে বলে তার বিশ্বাস।
অভিবাসী শ্রমিকদের ভোগান্তি তার হৃদয়ে আঘাত করেছে
যে অংশের বক্তব্য অনুষ্ঠানস্থলে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ কাড়ে, তা ছিল অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে তার আবেগপূর্ণ মন্তব্য।
বছরের পর বছর বিদেশে থাকা, পরিবারের জন্য কঠোর পরিশ্রম করা, আর ঋণের চাপে দেশে ফিরতে না পারার বাস্তবতা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
তিনি বলেন, দেশের লাখো শ্রমিক বিদেশে জীবনযাপন করেন সীমিত আয় আর প্রচণ্ড কঠোর পরিশ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে।
অনেকেই দেশে ফিরতে চান, পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে চান, কিন্তু বিমান ভাড়া এত বেশি যে তারা টিকিট কেনার কথাও ভাবতে পারেন না।
এই মানবিক সংকটকে উপেক্ষা করা যায় না—এমন দৃঢ় অবস্থান জানান তিনি।
উপদেষ্টার ভাষায়, “এরা আমাদের দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠায়, অর্থনীতিকে সচল রাখে। অথচ তাদের দেশে ফেরার পথটাই যদি এত ব্যয়বহুল হয়, তাহলে সেটি আমাদের ব্যর্থতা।”
ফ্লাইএডিয়ালের নতুন রুট, নতুন প্রতিশ্রুতি
অনুষ্ঠানে ফ্লাইএডিয়াল জেদ্দা–ঢাকা–জেদ্দা রুটে সাপ্তাহিক দুটি সরাসরি ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দেয়।
বিমান সংস্থাটি জানায়, তারা প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া, বিমানে বিনামূল্যে খাবার এবং অতিরিক্ত লাগেজ সুবিধা দেবে—যা মূলত অভিবাসী শ্রমিক ও হজ–ওমরাহ যাত্রীদের মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ জাফর এইচ. বিন আবিয়ান, ফ্লাইএডিয়ালের সিইও স্টিভেন গ্রিনওয়ে এবং অ্যাভিয়ান্স বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরান জাহান।
উপদেষ্টা বশিরউদ্দিনের বক্তব্য পরিষ্কার—বাংলাদেশের বিমান খাতে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং সাশ্রয়ী সেবা ফিরে পেতে এখনই করণীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।
তিনি যেভাবে একে একে জটিল সমস্যার দিকে আঙুল তুলেছেন, তাতে বোঝা যায় সামনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।



