ধ্বংসের পথে ৪০০ বছরের পানাম নগরীর গৌরবময় ঐতিহ্য, জরুরি সংরক্ষণের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক পানাম নগরী বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একসময়ের জমজমাট বাণিজ্যকেন্দ্র ও বাংলার সমৃদ্ধির প্রতীক এই নগরী আজ ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে চলেছে। প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এই স্থাপত্যগুলোতে উপমহাদেশীয় মুঘল স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে ইউরোপীয় উপনিবেশিক প্রভাবের অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা, রক্ষণাবেক্ষণের চরম অভাব, প্রাকৃতিক ক্ষয়, বন্যা, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং কিছু ক্ষেত্রে অবৈধ দখলদারির কারণে প্রতিটি ভবন এখন মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পানাম নগরীর ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। মুঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগ পর্যন্ত এটি ছিল বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। বিশেষ করে মসলিন ও অন্যান্য বস্ত্র ব্যবসার জন্য বিখ্যাত এই নগরীতে একসময় সারি সারি অট্টালিকা গড়ে উঠেছিল। রাস্তার দু’পাশে মোট ১০২টি ভবন ছিল বলে জানা যায়, যার মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৫২টি কোনোরকমে টিকে আছে। উত্তর দিকে ৩১টি এবং দক্ষিণ দিকে ২১টি ভবন এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দু’টি ভবন (নম্বর ৪ ও ১৩) আংশিকভাবে সংস্কার করা হয়েছে। বাকিগুলোর দেয়ালে বড় বড় ফাটল, ছাদের অংশ ধসে পড়ার আশঙ্কা, কাঠের কাঠামো পচে যাওয়া এবং ভিত্তির দুর্বলতা—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে চলেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুসারে, বর্ষাকালে বন্যার পানি এবং সারা বছর ধরে বৃষ্টি-রোদের প্রভাবে ভবনগুলোর ক্ষয় আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে। অনেক ভবনের ভিতরে গাছের শিকড় ঢুকে পড়েছে, যা কাঠামোকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। পর্যটকদের জন্য এই স্থানটি এখনও আকর্ষণীয় হলেও নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রায় অনুপস্থিত। অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছেন, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ডেকে আনতে পারে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় থাকলেও পর্যাপ্ত নজরদারি ও সংরক্ষণ কার্যক্রমের অভাবে সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পানাম নগরী শুধু একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়, বরং বাংলার সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। এখানকার ভবনগুলোতে মুঘল আমলের খিলান, ইউরোপীয় স্টাইলের জানালা-দরজা, অলংকরণ এবং অভ্যন্তরীণ নকশা এখনও দেখা যায়। কিন্তু অবহেলার কারণে অনেক স্থাপনা ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ১৯৭৭-৭৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রায় অর্ধেক ভবন ধ্বংস হয়েছে বলে জানা যায়। কিছু ভবন ব্যক্তিগত লোভে ভেঙে ফেলা হয়েছে, আবার কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগে। বর্তমানে অবশিষ্ট ভবনগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই ‘ঘোস্ট সিটি’ বা ‘মৃত নগরী’ হিসেবে পরিচিত।

সংস্কৃতি সচেতন মহল ও স্থানীয়দের দাবি, সরকারি উদ্যোগে একটি বৃহৎ ‘মেগা প্রজেক্ট’ গ্রহণ করা জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিটি ভবনের কাঠামোগত শক্তি পরীক্ষা, দেয়াল ও ছাদ মেরামত, জলনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন, আলোকসজ্জা ও সৌন্দর্যায়নের মাধ্যমেএটিকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তরিত করা সম্ভব। এমন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু ঐতিহ্য সংরক্ষণই নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। পর্যটক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, হোটেল, রেস্তোরাঁ, হস্তশিল্প ও স্থানীয় ব্যবসার প্রসার ঘটবে।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেছেন, “অতীতে কে কী করেছে তা আমার জানা নেই। পানাম সিটি আমাদের সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য বহন করে। এই পানাম সিটির কাঠামোগত শক্তি, সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সংসদে জোরালোভাবে প্রস্তাব রাখব।” তাঁর এই বক্তব্য স্থানীয়দের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

অতীতে কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কোরিয়াভিত্তিক কোম্পানির সহায়তায় কিছু ভবন সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছিল, কিন্তু তা স্থায়ী সমাধান হয়নি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কিছু ভবনের ডকুমেন্টেশন ও পাইলট প্রজেক্ট চালালেও বৃহত্তর পর্যায়ে কাজ এখনও অনেক পিছিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়াহয়, তাহলে অচিরেই এই অমূল্য ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে যাবে। ভূমিকম্প, বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

পানাম নগরীকে রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি সবার নৈতিক কর্তব্য। স্থানীয় প্রশাসন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে একটি ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন ৩ডি স্ক্যানিং, স্ট্রাকচারাল অ্যানালাইসিস এবং ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন ব্যবহার করে ভবনগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ওয়াকওয়ে, গাইড সার্ভিস, আলোকায়ন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে এটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

পানাম নগরীর সংরক্ষণ শুধু ইট-কাঠ-চুনের কাজ নয়, এটি আমাদের জাতীয় পরিচয় ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণ। যদি এখনই সঠিক উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে এই নগরী আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এবং বাংলাদেশের পর্যটন খাতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। সোনারগাঁয়ের এই ঐতিহাসিক সম্পদকে রক্ষা করতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা এখন সময়ের দাবি। না হলে আগামী প্রজন্ম হয়তো শুধু বইয়ের পাতায়ই দেখবে এই গৌরবময় নগরীর কথা।

প্রতিবেদক : ইসলাম রাইসুল

Read Previous

ওমান এয়ার ঢাকা থেকে ইউরোপের জনপ্রিয় গন্তব্যে আকর্ষণীয় ইকোনমি ক্লাস ভাড়া চালু করেছে

Read Next

জাহাঙ্গীরনগর ছাত্রদলের দুই নেতা কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নেতৃত্বে আসার দৌড়ে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular