২৪/০৪/২০২৬
১১ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিজেল সংকট ও লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত পর্যটন খাত: সন্ধ্যার পর অন্ধকারে হোটেল-মোটেল, মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন পর্যটকরা

নিজস্ব প্রতিনিধি। পর্যটন সংবাদ : দেশজুড়ে চলমান ডিজেল সংকট ও বাড়তি বিদ্যুৎ লোডশেডিং পর্যটন খাতে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টনির্ভর পর্যটন এলাকাগুলোতে সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, আর সেই জেনারেটর চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল মিলছে না বা পাওয়া গেলেও দাম অত্যন্ত বেশি। ফলাফল একটাই—সেবা ব্যাহত হচ্ছে, অতিথিরা অসন্তুষ্ট হচ্ছেন, আর নতুন বুকিং কমে যাচ্ছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, দিনের বেলা কোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও সন্ধ্যার পর লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় প্রকৃত সংকট শুরু হয়। লাইট, লিফট, এসি, গরম পানি, রেস্টুরেন্ট সার্ভিস—সবকিছুই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ না থাকলে আধুনিক হোটেল কার্যত অচল হয়ে পড়ে। অনেক রিসোর্ট বাধ্য হয়ে সন্ধ্যার পর কিছু অংশ বন্ধ রাখছে, আবার কোথাও অতিথিদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এসি ব্যবহার সীমিত করে দেওয়া হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা যেমন কক্সবাজার, সাজেক, শ্রীমঙ্গল এবং কুয়াকাটা। এসব এলাকায় সন্ধ্যার পর পর্যটকরা মূলত রিসোর্ট বা হোটেলের ভেতরেই সময় কাটান। সেই সময় বিদ্যুৎ না থাকলে পুরো ভ্রমণের অভিজ্ঞতাই নষ্ট হয়ে যায়।

কক্সবাজারের একটি মাঝারি মানের হোটেলের ব্যবস্থাপক আবদুল মালেক বলেন, “প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, আর তার বেশির ভাগটাই সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যে। আগে জেনারেটর দিয়ে সামাল দিতাম, কিন্তু এখন ডিজেলই পাওয়া যাচ্ছে না। পেলেও লিটারপ্রতি দাম এত বেশি যে খরচ উঠছে না। অতিথিরা অভিযোগ করছে, কেউ কেউ আগেই চেকআউট করে চলে যাচ্ছে।”

একই কথা বলছেন সাজেকের রিসোর্ট ব্যবসায়ী লালচান মারমা। তাঁর ভাষায়, “সাজেকে বিদ্যুৎ এমনিতেই সীমিত। জেনারেটরই ভরসা। কিন্তু ডিজেল সংকটের কারণে এখন রাতভর জেনারেটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না। পর্যটকরা পাহাড়ে এসে অন্ধকারে বসে থাকতে চায় না। তাই বুকিং বাতিল করছে।”

পর্যটকদের অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। ঢাকার পর্যটক রাশেদ মাহমুদ সম্প্রতি পরিবার নিয়ে শ্রীমঙ্গলে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “আমরা রিসোর্টে গিয়ে দেখি সন্ধ্যার পর বারবার বিদ্যুৎ যাচ্ছে। বাচ্চারা গরমে অস্থির হয়ে পড়েছিল। যেই শান্ত পরিবেশের জন্য গিয়েছিলাম, সেটাই আর পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে এমন অবস্থায় হলে হয়তো ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করব।”

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সমস্যাটা শুধু অতিথি অসন্তুষ্টি নয়, আর্থিক ক্ষতিও মারাত্মক। ডিজেল কিনতে অতিরিক্ত টাকা খরচ হচ্ছে, আবার সেই খরচ অতিথিদের ওপর পুরোপুরি চাপানোও যাচ্ছে না। ফলে লাভ তো হচ্ছেই না, অনেক ক্ষেত্রে লোকসান গুনতে হচ্ছে। ছোট ও মাঝারি হোটেল-মোটেলগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিতে, কারণ তাদের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত।

কুয়াকাটার এক রিসোর্ট মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “পর্যটন খাত এমনিতেই মৌসুমি। অফ-সিজনে টিকে থাকা কঠিন। এখন ডিজেল আর লোডশেডিংয়ের চাপ যোগ হওয়ায় অনেকেই ভাবছে ব্যবসা বন্ধ করে দেবে। ব্যাংক ঋণ, কর্মচারীদের বেতন—সবকিছু মেটানো দায় হয়ে যাচ্ছে।”

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন বড় ধাক্কা খাবে। ভ্রমণ মানেই স্বস্তি, আরাম আর নিরাপত্তা। সেখানে যদি মৌলিক সেবা নিশ্চিত না থাকে, তাহলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প খুঁজবে বা ভ্রমণই বাদ দেবে। এর প্রভাব পড়বে হোটেল ছাড়াও পরিবহন, রেস্টুরেন্ট, স্থানীয় গাইড, হস্তশিল্প বিক্রেতাসহ পুরো পর্যটন ইকোসিস্টেমে।

অনেক ব্যবসায়ী সরকারের হস্তক্ষেপ চান। তাদের দাবি, পর্যটন এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়া হোক অথবা হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোর জন্য বিশেষ কোটা ভিত্তিতে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক। কেউ কেউ সৌরবিদ্যুৎ বা বিকল্প জ্বালানির কথা বললেও বাস্তবতা হলো, স্বল্পমেয়াদে এসব সমাধান বাস্তবায়ন করা কঠিন।

পর্যটন বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকট শুধু একটি মৌসুমের সমস্যা নয়, বরং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য সতর্কবার্তা। শক্তি ব্যবস্থাপনা ও পর্যটন উন্নয়ন একসঙ্গে না ভাবলে এমন পরিস্থিতি বারবার ফিরে আসবে। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে দেশের পর্যটন খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে ডিজেল সংকট ও বাড়তি লোডশেডিং দেশের হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট শিল্পকে এক অনিশ্চিত অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছেন, আর পর্যটকরা অপেক্ষা করছেন—কবে আবার নিরবচ্ছিন্ন আলোয়, স্বস্তির পরিবেশে ভ্রমণ করা যাবে।

প্রতিবেদক: মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ

Read Previous

হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ১৬ ডিসেম্বর বা নতুন বছরে উদ্বোধন: প্রতিমন্ত্রী

Read Next

পূর্বাচলকে ঘিরে নতুন পর্যটন সম্ভাবনা: রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আধুনিক নগর সুবিধা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular