
টাংঙ্গোয়ার হাওর, ফাইল ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বের জলাভূমি অঞ্চলগুলো বহু বছর ধরে পরিবেশগত চাপের মধ্যে আছে। সেই তালিকার শীর্ষে যে নামটি বারবার আসে, সেটি টাঙ্গুয়ার হাওর। মিঠা পানির এই বিশাল জলাধার শুধু প্রাকৃতিক সম্পদেই সমৃদ্ধ নয়—এটি জীবিকার জন্য সরাসরি নির্ভরশীল হাজারো মানুষের ভরসা। সেই হাওরকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড় করাতে নতুন করে শুরু হয়েছে ৪৪ কোটি টাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, যার অর্থায়ন করেছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)।
এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত। পুরো সময়জুড়ে লক্ষ্য থাকছে দুই দিক—জলাভূমির পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকা শক্তিশালী করা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে পরিবেশ অধিদপ্তর, আর নকশা থেকে মাঠপর্যায়ের কাজ পর্যন্ত পরিচালনা করবে একটি বিশেষায়িত পরামর্শদাতা সংস্থা।
প্রকল্পের মূল ফোকাস: বাস্তুতন্ত্র পুনর্গঠন
টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু মাছ আর জলজ উদ্ভিদের ভাণ্ডার নয়, পরিযায়ী পাখিদেরও আশ্রয়স্থল। কিন্তু গত এক দশকে এই এলাকার সম্পদ দ্রুত কমে গেছে। খরা, দখল, দূষণ, নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন উদ্যোগটির লক্ষ্য এই ক্ষয় রোধ করা।
প্রকল্প পরিচালক শাহেদা বেগম এক কর্মশালায় জানান, কাজের শুরুতেই বাস্তুতন্ত্রের বর্তমান অবস্থা চিহ্নিত করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে নেওয়া হবে আবাসস্থল পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম। এর মধ্যে থাকতে পারে জলধারার প্রবাহ উন্নত করা, প্রাকৃতিক উদ্ভিদবৃন্দ পুনরায় লাগানো, এবং নির্দিষ্ট এলাকায় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র পুনর্গঠন।
স্থানীয়দের সক্রিয় সম্পৃক্ততা প্রকল্পের ভিত্তি
হাওরকে বাঁচাতে স্থানীয় মানুষের ভূমিকা সবচেয়ে বড়—এটা সবাই জানে। ঠিক এই কারণেই প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কমিউনিটি-ভিত্তিক সংরক্ষণকে।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, শুধু সরকারি উদ্যোগে এমন একটি জটিল জলাভূমিকে রক্ষা করা যাবে না। স্থানীয় কৃষক, জেলে, নৌকার মাঝি—যারা প্রতিদিন হাওরের সঙ্গে নাড়ির টানে যুক্ত—তাদের জন্য বিকল্প আয়ের পথ তৈরি না হলে সংরক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
এই প্রকল্পে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে বিভিন্ন দলের মানুষকে—মাছ ধরার টেকসই পদ্ধতি, জলাভূমি রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব পর্যটনসহ আরও নানা বিষয়ে। এর পাশাপাশি গড়ে তোলা হবে এমন সুযোগ, যাতে হাওরের ওপর নির্ভরশীল মানুষ চাপ কমিয়ে জীবিকা বজায় রাখতে পারে।
প্রশাসনিক কাঠামো আরও সুসংগঠিত
শুধু প্রকল্পই নয়, সরকারের পক্ষ থেকেও হাওর ব্যবস্থাপনায় নতুন একটি কাঠামো যুক্ত করা হয়েছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার মহাপরিচালক লুৎফুর রহমান স্বাক্ষরিত নতুন বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে হাওর ব্যবস্থাপনা কীভাবে এগোবে।
এতে তিন ধাপের পরিকল্পনা আছে—স্বল্পমেয়াদী দুই বছর, মধ্যমেয়াদী পাঁচ বছর, আর দীর্ঘমেয়াদী দশ বছর। টাঙ্গুয়ার পাশাপাশি হাকালুকি হাওরও এই পরিকল্পনার আওতায় আসছে।
সংরক্ষণ কার্যক্রম দেখভাল করবে দশ সদস্যের একটি কমিটি, যার সভাপতি জেলা প্রশাসক। কমিটির দায়িত্ব হলো প্রকল্পের অগ্রগতি নজরদারি করা, নীতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা।
অঞ্চলভুক্ত ইউনিয়নগুলোর তালিকা হালনাগাদ
টাঙ্গুয়ার হাওর সুরক্ষা আদেশের আওতাভুক্ত ইউনিয়নের তালিকায় যোগ হয়েছে চারটি ইউনিয়ন —
বংশীকুণ্ড উত্তর,
বংশীকুণ্ড দক্ষিণ,
শ্রীপুর (দক্ষিণ),
শ্রীপুর (উত্তর)।
এগুলোর আওতায় থাকা মৌজা—টাঙ্গুয়ার হাওর, মোয়াজ্জেমপুর, কিসমত মেন্ডাটা, জগদীশপুর, লামাগাঁও এবং রাঙ্গাছড়া পূর্ব—এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ ব্যবস্থার অংশ।
প্রকল্পের প্রত্যাশিত ফলাফল
যদি পরিকল্পনাগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু পরিবেশগত দিক থেকে পুনরায় প্রাণ ফিরে পাবে না—স্থানীয় জীবিকাও আরও স্থিতিশীল হবে। এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে জলাভূমির প্রাকৃতিক ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য, এবং মানুষের সহাবস্থানকে নতুন পথ দেখাতে পারে।
সাধারণভাবে বলতে গেলে, লক্ষ্য একটাই—হাওরকে এমন স্থিতিতে ফেরানো, যেখানে প্রকৃতি ও মানুষ দু’পক্ষই নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা পায়।
প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার



