
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : লিঙ্গসমতা, নারীর কর্মসংস্থান এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে উন্নয়নের মূল স্রোতে আনতে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে কেয়ার অর্থনীতিকে ঘিরে নতুন চিন্তার যাত্রা। সেই যাত্রার কেন্দ্রে ছিল ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় কেয়ার কনক্লেভ ২০২৬। সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, নীতিনির্ধারক, শ্রমিক প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও সুশীল সমাজের নেতাদের অংশগ্রহণে এই কনক্লেভে স্পষ্ট বার্তা উঠে আসে—কেয়ার আর ব্যক্তিগত বা অদৃশ্য দায়িত্ব নয়, এটি এখন জাতীয় উন্নয়নের কৌশলগত অগ্রাধিকার।
দিনব্যাপী এই কনক্লেভটি যৌথভাবে আয়োজন করে International Labour Organization, UN Women এবং Asian Development Bank। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে রাজধানীর Pan Pacific Sonargaon Hotel-এ আয়োজিত এই কনক্লেভে নীতি ও বাস্তবতার মাঝখানে থাকা দূরত্ব কমানোর দিকেই ছিল মূল নজর।
এই আয়োজনের প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। যদিও নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে, বাস্তব চিত্র এখনও চ্যালেঞ্জে ভরা। অবৈতনিক কেয়ার কাজের অতিরিক্ত দায়, মজুরি বৈষম্য, আংশিক কর্মসংস্থান এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীদের উচ্চ উপস্থিতি নারীর পূর্ণ অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে সীমিত করে রাখছে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ গীতাঞ্জলি সিং জোর দিয়ে বলেন, কেয়ার ব্যবস্থায় বিনিয়োগ মানে শুধু সামাজিক দায় পালন নয়—এটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। অবৈতনিক কেয়ার কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া, এর বোঝা কমানো এবং ন্যায্যভাবে ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়েই নারী, পরিবার ও সমাজের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যেতে পারে।
মূল আলোচনা পর্বে আইএলও ও এডিবির প্রতিনিধিরা শিশু যত্ন, দীর্ঘমেয়াদি কেয়ার এবং পরিবারবান্ধব শ্রমনীতিতে বিনিয়োগের সুদূরপ্রসারী প্রভাব তুলে ধরেন। আইএলওর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রারম্ভিক শিশু যত্ন ও শিক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি কেয়ার সেবায় সার্বজনীন বিনিয়োগ ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে সাত মিলিয়নেরও বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। এর সুফল শুধু কেয়ার খাতেই নয়, অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ বাড়াবে এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
মন্ত্রণালয় পর্যায়ের সংলাপে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা কেয়ার অর্থনীতিকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। আলোচনায় শিশু যত্ন সেবার সম্প্রসারণ, দীর্ঘমেয়াদি কেয়ার ব্যবস্থার কাঠামো গঠন, শ্রম সুরক্ষা জোরদার এবং দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে জাতীয় নীতির সমন্বয়ের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
অধিবেশন শেষে আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন বলেন, কেয়ারকে ব্যক্তিগত দায়িত্বের সীমা থেকে বের করে জননীতির অগ্রাধিকারে আনাই পারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও লিঙ্গসমতার নতুন চালিকাশক্তি তৈরি করতে। মানসম্মত ও সহজলভ্য শিশু যত্ন এবং দীর্ঘমেয়াদি কেয়ার সেবা সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকারও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।
“কমিটমেন্ট থেকে অ্যাকশনে: বাংলাদেশে কেয়ার অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়া” শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনায় নীতিগত অঙ্গীকারকে বাস্তব সংস্কারে রূপ দেওয়ার পথ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। পাশাপাশি একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ মার্কেটপ্লেসে দেশের বিদ্যমান শিশু যত্ন সেবা মডেল, কেয়ার প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং প্রবীণ ও দীর্ঘমেয়াদি কেয়ার উদ্যোগগুলো তুলে ধরা হয়।
দিনের শেষভাগে অনুষ্ঠিত কারিগরি অধিবেশনগুলোতে মানবসম্পদ উন্নয়ন, তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়ন, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন এবং শ্রম সুরক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কেয়ারকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়গুলো গভীরভাবে আলোচিত হয়। আলোচনাগুলো থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—কেয়ার অর্থনীতিতে বিনিয়োগ মানে শুধু সামাজিক উন্নয়ন নয়, এটি বাংলাদেশের টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের একটি শক্ত ভিত্তি।


