
ছবি : কোলাজ
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : রাজধানী ঢাকার প্রায় ২০ হাজার হোটেল ও রেস্তোরাঁর অধিকাংশই রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। গত তিন মাসে এলপিজির দাম প্রায় ৪৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় খাতটির উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সঙ্গে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি যোগ হয়ে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে খাবার প্রস্তুতের খরচ অনেক বেড়েছে। তবে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং গ্রাহকদের সম্ভাব্য অসন্তোষের আশঙ্কায় সরাসরি খাবারের দাম বাড়ানোর পথে যেতে চান না তারা। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প কৌশল অবলম্বন করছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁ খাবারের মূল্য আগের মতো রেখে দিয়েছে, কিন্তু পরিবেশনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় ভাতের পরিমাণ কমানো হয়েছে, আবার কোথাও মাংস বা অন্যান্য তরকারির অংশ হ্রাস করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, মূল্য না বাড়িয়ে ব্যয় সমন্বয়ের জন্য এটাই বর্তমানে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
উৎপাদন খরচ কমাতে কিছু রেস্তোরাঁ এলপিজির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার শুরু করেছে। কোথাও কোথাও কয়লা ও লাকড়ির মতো সস্তা বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে তারা। তবে এসব বিকল্পের কার্যকারিতা, নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের পরিবর্তন খাদ্যের স্বাদ ও মানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার হোটেল ও রেস্তোরাঁ ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে যা নগরীর খাদ্যসেবা খাতের সংকটকে স্পষ্ট করে তুলেছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তথ্য অনুসারে, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৩৫৬ টাকা থেকে বর্তমানে ১ হাজার ৯৪০ টাকায় উঠেছে। এই বৃদ্ধি রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের ব্যয় কাঠামোয় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
পুরান ঢাকা ও কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার অনেক রেস্তোরাঁয় আগে গ্রাহকদের জন্য বিনামূল্যে আনলিমিটেড ভাত, ডাল, অতিরিক্ত ঝোল বা আলু দেওয়ার প্রচলন ছিল। কিন্তু বর্তমান ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সেই সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্তির পথে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন অতিরিক্ত খাবারের জন্য আলাদা মূল্য নির্ধারণ করতে বাধ্য হচ্ছে।
এই চাপ শুধু বাণিজ্যিক রেস্তোরাঁয় সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যান্টিনেও এর প্রভাব পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ক্যান্টিনে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নানা সুবিধা সংকুচিত করা হয়েছে। বাবুর্চি রেস্টুরেন্ট ও প্রিমিয়াম ক্যাটারিং সার্ভিসের মালিক রাহাতুল করিম বলেন, “আগের সেই আপ্যায়নের সংস্কৃতি এখন আর নেই। যে নমনীয়তা আমরা আগে দিতাম, সেটা এখন আর সম্ভব নয়। পরিস্থিতি এমন যে শুধু বেঁচে থাকার জন্যই ব্যবসা চালাতে হচ্ছে, লাভের অংশ প্রায় পুরোটাই খরচ হয়ে যাচ্ছে।”
রেস্তোরাঁ মালিকরা জানান, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দামের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে খাবারের দাম বাড়ানো বা সেবার মান আরও কমিয়ে দেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। তাতে ক্রেতা ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রেস্তোরাঁয় আলো, এসি, ফ্রিজ, ডিপ ফ্রিজ সবকিছুই বিদ্যুৎনির্ভর। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
‘স্বাদের আঙিনা’ ও ‘নন্দিনী’ রেস্তোরাঁর স্বত্বাধিকারী ফাহাদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, “পাইপলাইন গ্যাসের সংযোগ থাকলেও চাপের অভাবে ঢাকার প্রায় ৮০ শতাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁ এলপিজির ওপর নির্ভর করছে। আগে যে গ্যাস ১ হাজার ৪০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা ২ হাজার ২০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। শুধু জ্বালানি খাতেই এক-তৃতীয়াংশ খরচ বেড়ে গেছে। অনেকে তাই বৈদ্যুতিক চুলা, কয়লা বা লাকড়ির দিকে ঝুঁকছে।”
তবে সব রেস্তোরাঁয় এসব বিকল্প জ্বালানির অবকাঠামো নেই। সনাতন পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষ বাবুর্চির অভাব এবং উচ্চ মজুরির কারণে খরচ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফাহাদ হোসেন আরও বলেন, “আগে গ্রস প্রফিট ১৮-২০ শতাংশ থাকলেও এখন তা ১৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। নিট প্রফিটও ১০-১২ শতাংশের নিচে চলে যাবে। এই পরিস্থিতিতে খাবারের পরিমাণ সামান্য কমিয়ে এবং মেন্যুতে পরিবর্তন এনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।”
অভিজাত এলাকার ক্যাফেগুলোও এই চাপে পড়েছে। গুলশানের প্রিমিয়াম ক্যাফে ‘আলোকিত স্বপ্ন’ রেস্তোরাঁর মালিক নাফিস আহমেদ জানান, উৎপাদন খরচ ১০-১৫ শতাংশ বেড়েছে। তিনি বলেন, “খরচ বাড়লেও এখনো খাবারের দাম বাড়াইনি। দাম বাড়ালে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ব।” গুলশানের মতো এলাকায় গ্রাহকের সংখ্যা কম না হলেও লাভের হার ধরে রাখতে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
রেস্তোরাঁ মালিকরা কাঁচামাল, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যবসা চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন। তারা সরকারের কাছে জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ, ভ্যাট কাঠামো সহজীকরণ এবং বাণিজ্যিক গ্যাস সংযোগ পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “এলপিজি ও নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দামের কারণে আগে থেকেই ব্যবসা চালানো কঠিন ছিল। বিদ্যুতের নতুন দাম বৃদ্ধির ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি রেস্তোরাঁর ব্যবসায়ীরা চরম সংকটে পড়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার যদি এ খাতকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি না দেয় এবং সুবিধা না দেয়, তাহলে পুরো খাতে ধস নামবে।” তিনি নিজেও লোকসান সামলাতে না পেরে দুটি রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানান।
এই সংকটের মধ্যে গ্রাহকরাও প্রভাবিত হচ্ছেন। অনেকে অভিযোগ করছেন যে খাবারের পরিমাণ কম হলেও দাম একই রাখায় মূল্য অনুভূতিতে অসন্তোষ বাড়ছে। কেউ কেউ বলছেন, মানসম্পন্ন খাবার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিলে এই খাত আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
সার্বিকভাবে, এলপিজি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শুধু রেস্তোরাঁ খাতকেই নয়, পুরো খাদ্যসেবা ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ব্যবসায়ীরা বিকল্প কৌশলের মাধ্যমে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামলালেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না হলে খাতটির টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। গ্রাহকদের সাশ্রয়ী ও মানসম্পন্ন খাবার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার



