
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী হাজারি গুড় অবশেষে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি লাভ করেছে। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে খেজুর গাছের রস থেকে হাতে তৈরি এই বিশেষ গুড়ের অনন্য স্বাদ, মনমাতানো ঘ্রাণ এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গুণাগুণ এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সুরক্ষিত হলো। এই স্বীকৃতি শুধু স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য নয়, পুরো জেলার অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদের জন্য একটি মাইলফলক।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) গত সোমবার হাজারি গুড়ের জিআই নিবন্ধন সনদ ইস্যু করে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা এ তথ্য নিশ্চিত করেন। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন স্বাক্ষরিত জিআই (আর) ফরম-১ অনুসারে, ‘মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়’ জেলা প্রশাসক, মানিকগঞ্জের নামে ৩০ শ্রেণিতে জিআই-৬২ নম্বরে নিবন্ধিত হয়েছে। এই সনদ প্রকৃত উৎপাদকদের নাম ও অঞ্চলের সাথে পণ্যটিকে স্থায়ীভাবে যুক্ত করবে এবং নকল প্রতিরোধে সহায়ক হবে।
হাজারি গুড়ের ইতিহাস গভীর। হরিরামপুরের ঝিটকা এলাকায় একজন প্রখ্যাত গাছি হাজারির নামানুসারে এর নামকরণ হয় বলে জানা যায়। প্রায় দুইশ বছর আগে থেকে এখানকার মানুষ শীতকালে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে বিশেষ কৌশলে গুড় তৈরি করে আসছেন। এই প্রক্রিয়ায় রসকে ধীরে ধীরে জ্বাল দিয়ে ঘনীভূত করা হয়, যাতে এর প্রাকৃতিক স্বাদ ও গুণাগুণ অটুট থাকে। সাধারণ গুড়ের সঙ্গে হাজারি গুড়ের পার্থক্য স্পষ্ট। হাতে নিয়ে চাপ দিলেই এটি সূক্ষ্ম গুঁড়ো হয়ে যায়, যা এর বিশুদ্ধতা ও বিশেষ প্রস্তুত পদ্ধতির প্রমাণ। এর স্বাদ মিষ্টি কিন্তু অতিরিক্ত আঠালো নয়, আর ঘ্রাণে খেজুরের স্বাভাবিক মাধুর্য মিশে থাকে।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, একসময় এই গুড় শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেই নয়, বিদেশেও জনপ্রিয় ছিল। জনশ্রুতি আছে যে, ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ এই গুড়ের স্বাদ গ্রহণ করে প্রশংসা করেছিলেন এবং এর স্মারক হিসেবে একটি ব্রাস সিলও পাঠিয়েছিলেন বলে কথিত আছে। যদিও লিখিত প্রমাণ সীমিত, তবু এই গল্প স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। হাজারি গুড়ের সুনাম এতটাই ছড়িয়েছে যে, মানিকগঞ্জ জেলার ব্র্যান্ডিংয়ে এটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে—‘হাজারি আর বাউলগান, মানিকগঞ্জের আসল প্রাণ’। বাউল সংগীতের সঙ্গে এই গুড়ের সংযোগ জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
জিআই সনদ পাওয়ায় স্থানীয় গুড় প্রস্তুতকারকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। ঝিটকা এলাকার গাছি রহিজ উদ্দিন ও মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, “এই স্বীকৃতি আমাদের শ্রমের মূল্যায়ন। নকল গুড়ের ছড়াছড়ি কমবে, প্রকৃত উৎপাদকরা লাভবান হবেন। বিদেশে রপ্তানির সুযোগও বাড়বে।” বর্তমানে হাজারি গুড়ের বাজার মূল্যও তুলনামূলকভাবে উঁচু। শীত মৌসুমে এর চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। অনেক পরিবার এই গুড় তৈরিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জিআই স্বীকৃতির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বব্যাপী জিআই ট্যাগ পণ্যগুলো তাদের উৎপত্তিস্থলের সাথে যুক্ত থেকে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের দার্জিলিং চা, ইতালির পারমেসান চিজ বা থাইল্যান্ডের জেসমিন রাইস। বাংলাদেশেও ইতোমধ্যে কয়েকটি পণ্য জিআই সনদ পেয়েছে। হাজারি গুড় এই তালিকায় যুক্ত হয়ে দেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের প্রচারে নতুন মাত্রা যোগ করবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের স্বতন্ত্রতা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে।
মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার উদ্যোগে এ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। জেলা প্রশাসনসহ স্থানীয় প্রশাসন ও উৎপাদকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, “হাজারি গুড় শুধু একটি পণ্য নয়, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। জিআই সনদ এর সুরক্ষা ও প্রচারে সহায়ক হবে।”
এই স্বীকৃতির পরবর্তী ধাপ হিসেবে স্থানীয় উৎপাদকদের প্রশিক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্র্যান্ডিংয়ে আরও বিনিয়োগের প্রয়োজন। অনেকে আশা করছেন, এর ফলে হাজারি গুড়কে কেন্দ্র করে পর্যটনও বিকশিত হবে। ঝিটকা অঞ্চলে গুড় তৈরির প্রক্রিয়া দেখতে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করা যেতে পারে। সাথে বাউল সংগীতের আয়োজন করে সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন করলে জেলার পর্যটন সম্ভাবনা আরও বৃদ্ধি পাবে।
তবে চ্যালেঞ্জও আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খেজুর গাছের সংখ্যা কমছে। রস সংগ্রহের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি আধুনিকায়ন করতে হবে যাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ে কিন্তু গুণগত মান অটুট থাকে। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতায় খেজুর বাগান সংরক্ষণ ও নতুন করে রোপণ কর্মসূচি নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি নকল পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে যাতে সনদের সুফল প্রকৃত উৎপাদকরা পান।
হাজারি গুড়ের এই অর্জন শুধু মানিকগঞ্জের নয়, পুরো বাংলাদেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি উদাহরণ। এটি প্রমাণ করে যে, স্থানীয় জ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতা যথাযথ স্বীকৃতি পেলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে পারে। ভবিষ্যতে আরও অনেক ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে জিআই সনদের আওতায় আনার মাধ্যমে দেশের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব।
হাজারি গুড়ের মিষ্টি স্বাদ এখন শুধু জিভে নয়, জাতীয় গর্বের অংশ হয়ে উঠেছে। এই স্বীকৃতি স্থানীয় যুবকদের ঐতিহ্যবাহী পেশায় ফিরিয়ে আনতে উৎসাহ জোগাবে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই শিল্পকে বহন করতে সাহায্য করবে। মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়—একটি ঐতিহ্য, একটি স্বপ্ন এবং এখন একটি আনুষ্ঠানিকভাবে সুরক্ষিত জাতীয় সম্পদ।



