
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : কক্সবাজার, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত এই পর্যটন নগরী এখন যেন নির্জনতার আড়ালে লুকিয়ে আছে। সকাল ১০টায় কলাতলী সৈকতে এক কিলোমিটারজুড়ে সাজানো পাঁচ শতাধিক চেয়ার-ছাতা, কিন্তু পর্যটক মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন। ঢেউয়ের শব্দ আর বাতাসের স্পর্শ ছাড়া আর কোনো সাড়া নেই। দূরে একটি জেটস্কি ভাসছে, চালক অপেক্ষায়, কিন্তু যাত্রী নেই। সুগন্ধা, সিগাল ও লাবণী পয়েন্ট ঘুরেও একই চিত্র—পাঁচ কিলোমিটার সৈকতজুড়ে পর্যটকের আনাগোনা প্রায় শূন্য।
রমজান শুরুর পর থেকেই এই পরিস্থিতি। ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে সৈকত এলাকা যেন পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে। অথচ রমজানের আগে চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারিতে কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত সৈকতে দেড় লাখেরও বেশি পর্যটকের সমাগম হয়েছিল। সেই উচ্ছ্বাসের পর রোজা শুরু হতেই সবকিছু থমকে গেছে।
পর্যটক না থাকায় সৈকতকেন্দ্রিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে। অন্তত তিন হাজার দোকান-প্রতিষ্ঠানের দরজা বন্ধ। কয়েক শ ভ্রাম্যমাণ আলোকচিত্রী ক্যামেরা হাতে অলস বসে আছেন। শতাধিক ঘোড়া ও বিচ-বাইক সারি করে দাঁড়িয়ে। শামুক-ঝিনুক ও সামুদ্রিক পণ্যের দেড় শতাধিক দোকানে ক্রেতার দেখা নেই। জেটস্কি, ঘোড়ায় চড়া, ছবি তোলা—সবকিছুই যেন অপেক্ষায় রয়েছে।
হোটেল-রিসোর্ট মালিকরা পর্যটক আকর্ষণে বড় ছাড় ঘোষণা করেছেন। পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউস ও কটেজে কক্ষভাড়ায় সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে। যেখানে দুই হাজার টাকার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ এখন ৮০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এই আকর্ষণীয় অফারেও সাড়া মিলছে না। কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, “রমজানে পর্যটক কম আসে—এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়।” গত বৃহস্পতিবার হোটেলগুলোতে প্রায় তিন হাজার অতিথি ছিলেন, শুক্রবার তা সাড়ে তিন হাজারে উঠলেও শনিবার থেকে দেড় হাজারে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা। বর্তমানে ৯৫ শতাংশ কক্ষ খালি পড়ে আছে।
এই নির্জনতা কারও কাছে আনন্দের, কারও কাছে ভোগান্তির। ঢাকার মিরপুর থেকে আসা নবদম্পতি সুজা উদ্দিন ও কামরুন নাহার তারকা হোটেলে উঠেছেন। সুজা বলেন, “রমজানে অনেকে অফিস-বাসা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, ঘুরতে আসেন না। কিন্তু আমাদের কাছে এ সময়টা আলাদা। নির্জন সৈকতে বসে ঢেউয়ের শব্দ শোনা অন্যরকম অভিজ্ঞতা।” তবে এই নির্জনতার মাঝে সমস্যাও কম নয়। সৈকত এলাকার শতাধিক রেস্তোরাঁ ও দোকানপাট বন্ধ থাকায় খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। কুমিল্লার ব্যবসায়ী সৈয়দুল কবির বলেন, “পরিবেশ ভালো লাগছে, কিন্তু শিশুদের নিয়ে খাবারের দোকান বন্ধ থাকায় সমস্যা হচ্ছে। ধর্মীয় বিধান মেনে কিছু রেস্তোরাঁ খোলা থাকলে সুবিধা হতো।”
কক্সবাজার শহরে সাত শতাধিক রেস্তোরাঁ রয়েছে, সৈকতে ভাজা মাছসহ খাবারের প্রায় ৩০০ ভ্রাম্যমাণ ভ্যান। রমজানে প্রায় সবই বন্ধ। তবে কলাতলী হোটেল জোনে কেএফসি, পিৎজাহাটের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান খোলা রয়েছে এবং কিছু জায়গায় বিকেলে ইফতার সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে।
হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, রমজানে কর্মচারীদের ছুটি দেওয়া দীর্ঘদিনের চর্চা। এ বছর ৫০ হাজার কর্মীর মধ্যে প্রায় ৩২ হাজারকে অগ্রিম বেতন-ভাতা দিয়ে ছুটি দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট কর্মীরা সীমিত পরিসরে কাজ করছেন। অনেক হোটেলে সংস্কার ও রঙের কাজ চলছে। ব্যবসায়ীদের আশা, ঈদুল ফিতরের দ্বিতীয় দিন থেকে আবার পর্যটকে ভরপুর হয়ে উঠবে সৈকত। তখন হোটেল, দোকান, বিনোদনকেন্দ্র সবকিছু চাঙা হয়ে উঠবে।
রমজানের এই নিস্তব্ধতা কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের জন্য একটি স্বাভাবিক চক্র হলেও ব্যবসায়ীদের জন্য চ্যালেঞ্জ। ছাড়ের পরও পর্যটক না আসায় লোকসানের মুখে পড়েছেন অনেকে। তবে যারা এসেছেন, তারা নির্জনতা ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। ঈদের ছুটির অপেক্ষায় এখন সবাই—সৈকত, হোটেল, ব্যবসায়ী সবাই।
প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার



