নির্বাচন–রমজান–মৌসুম বদলের চাপ: ছাড়েই ভরসা পর্যটন খাতের

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : 

শীতকাল শেষ হতে না হতেই দেশের পর্যটন খাতে ভাটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই সময়টাই দেশের প্রধান ভ্রমণ মৌসুম। কিন্তু এবছর সেই পরিচিত চিত্র দেখা যায়নি। পর্যটন ব্যবসায়ীদের ভাষায়, নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ আর সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মিলিয়ে মৌসুমটা প্রত্যাশামতো জমেনি। তার ওপর সামনে পবিত্র রমজান। সব মিলিয়ে হোটেল, মোটেল আর রিসোর্টগুলোর সামনে এখন একটাই বাস্তবতা—অতিথি টানতে বড় ছাড়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে কয়েক দিন দেশের বড় পর্যটন এলাকাগুলো প্রায় ফাঁকাই ছিল। অনেক জায়গায় বুকিং বাতিল হয়েছে, আবার নতুন বুকিংও আসেনি। স্বাভাবিক সময়ে যে কক্ষগুলো সপ্তাহজুড়ে ভরা থাকে, সেগুলোও খালি পড়ে ছিল। ফলে মৌসুমের মাঝপথেই লোকসানের শঙ্কা তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে অনলাইন ট্রাভেল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপরও। ভ্রমণ খাতের পরিচিত প্রতিষ্ঠান শেয়ারট্রিপ–এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া হক জানান, গত বছরের তুলনায় এবছর পর্যটন খাতের ব্যবসা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। তাঁর মতে, নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা আর সামগ্রিক পরিবেশের কারণে মানুষের ভ্রমণের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব পড়েছে।

পর্যটনসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রমজান শুরু হলে এই প্রবণতা আরও বাড়বে। রোজার সময় পারিবারিক ও ধর্মীয় ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণত অবকাশযাপন ও ভ্রমণ কমে যায়। ফলে যেসব হোটেল ও রিসোর্ট শীতের মৌসুমে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চায়, তাদের সামনে সময়টা বেশ চ্যালেঞ্জিং। এই বাস্তবতায় অনেক প্রতিষ্ঠান আগেভাগেই বিশেষ রোজা প্যাকেজ, ইফতার ও সাহ্‌রি সুবিধাসহ আকর্ষণীয় ছাড় ঘোষণা করেছে।

গাজীপুরে রিসোর্ট ব্যবসার চাপ
রাজধানীর কাছের জনপ্রিয় গন্তব্য গাজীপুর–এ এই চাপ সবচেয়ে স্পষ্ট। এখানে অবস্থিত সারাহ রিসোর্ট চলতি বছরের জানুয়ারি থেকেই বড় ধরনের ছাড় দিয়ে আসছে। কক্ষভেদে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দেওয়া হয়, আর মাসের শেষদিকে সব কক্ষে প্রায় ৫৩ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ঘোষণা করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই—বুকিং ধরে রাখা।

একই এলাকার আরেক অভিজাত রিসোর্ট ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা। প্রতিষ্ঠানটির সহকারী ব্যবস্থাপক আতিকুর রহমান জানান, নির্বাচনের প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই অতিথির সংখ্যা কমতে শুরু করে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যেখানে কক্ষ বুকিংয়ের হার ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ, সেখানে এবছর ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে এসেছে ২০ শতাংশের কাছাকাছি। রমজানকে সামনে রেখে তারা সব কক্ষে ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

গাজীপুরের কালমেঘা কান্ট্রি ক্লাব অ্যান্ড রিসোর্টেও একই চিত্র। চলতি মাসে ভিলা বুকিংয়ে ৩০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে, আর রোজার সময়ের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড়। ছুটি রিসোর্টসহ আশপাশের বেশির ভাগ রিসোর্টই এখন রোজার আগে ও পরে ভিন্ন ভিন্ন প্যাকেজ সাজাচ্ছে।

সিলেট ও শ্রীমঙ্গলে বুকিং কম
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পর্যটন কেন্দ্র সিলেট সাধারণত শীত ও বর্ষা মৌসুমে পর্যটকে মুখর থাকে। ভালো ব্যবসা হলে এখানকার হোটেল–মোটেলগুলো থেকে সরকার মাসে গড়ে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব পায়। কিন্তু এবছর সেই গতি দেখা যায়নি। সিলেট অঞ্চলের আরেক জনপ্রিয় গন্তব্য শ্রীমঙ্গল, যাকে চায়ের রাজধানী বলা হয়, সেখানেও পরিস্থিতি অনেকটাই একই।

শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা রিসোর্টে জানুয়ারিতে সব কক্ষে প্রায় ৩২ শতাংশ ছাড় ছিল। বর্তমানে কিছু কক্ষে ছাড়ের পরিমাণ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। রিসোর্টটির রিজার্ভেশন এক্সিকিউটিভ অয়ন শর্মা জানান, গত বছরের তুলনায় এবছর রুম বুকিং প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। জানুয়ারিতে কিছুটা চাহিদা থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে তা দ্রুত কমে যায়। তাঁর অভিজ্ঞতায়, রোজার সময় টানা চার-পাঁচ দিন পর্যন্ত কোনো পর্যটক না আসার ঘটনাও নতুন নয়।

কক্সবাজারে ঈদের দিকে তাকিয়ে ব্যবসায়ীরা
সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজার–এও বুকিং কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। স্থানীয় হোটেল মালিকদের ধারণা, রোজা শুরু হলে পর্যটকের সংখ্যা আরও কমবে। তাই এখনই অনেক হোটেল ও রিসোর্ট ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ঘোষণা করেছে। কেউ কেউ ইফতার ও সাহ্‌রিভিত্তিক বিশেষ প্যাকেজ চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পাতে রোজার সময় একটি কক্ষের সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা, যা আগে ছিল আট হাজার টাকা। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বিপণন ও রাজস্ব কর্মকর্তা এ কে এম আসাদুর রহমান জানান, রোজার সময় সাধারণত পর্যটকদের ভ্রমণ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। তাঁর মতে, এবছর নির্বাচন উপলক্ষে মাসের শুরু থেকেই এই কমতি দেখা গেছে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ঈদকে ঘিরে ভালো ব্যবসার আশা করছেন তারা।
একইভাবে এক্সোটিকা সাম্পান হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত ৫০ শতাংশ মূল্যছাড় ঘোষণা করেছে। হোটেলটির রিজার্ভেশন এক্সিকিউটিভ আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, রোজায় পর্যটকদের আগ্রহ বাড়াতেই এই উদ্যোগ। তাঁর ভাষায়, নির্বাচন ও সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে চলতি মাসে বুকিং স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম।
সামনে কী?

পর্যটন বিশ্লেষকদের মতে, এবছরের শীত মৌসুম প্রত্যাশা অনুযায়ী না যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান এখন ঈদকেন্দ্রিক ব্যবসার দিকে তাকিয়ে আছে। রোজার সময় ছাড় দিয়ে হলেও খরচ ওঠানো, আর ঈদের ছুটিতে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়াই এখন মূল কৌশল। তবে সবকিছু নির্ভর করছে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মানুষের ভ্রমণের আস্থার ওপর। এই আস্থা ফিরলে তবেই আবার চেনা ছন্দে ফিরবে দেশের পর্যটন খাত।

Read Previous

বসন্তের রঙিন আগমন: ঢাকায় উৎসবের মেলা এবং নতুন প্রাণের স্পন্দন

Read Next

ধর্মীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে পর্যটন বার্তা: বুয়েনস এইরেসে রমজান প্রস্তুতিমূলক কোর্স ঘিরে বাড়ছে ইসলামিক ট্যুরিজমের সম্ভাবনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular