আইসক্রিম বিক্রেতা থেকে পর্যটনের মুখ: হোন সন দ্বীপে ট্রান ভ্যান তুয়ানের অনন্য গল্প

ট্রান ভেন তুয়ান

ট্রান ভেন তুয়ান

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : হোন সন দ্বীপের সৌন্দর্য নতুন কিছু নয়। নীল সমুদ্র, পাহাড়ঘেরা সৈকত আর নিরিবিলি জীবন—সব মিলিয়ে এটি ভিয়েতনামের আন গিয়াং প্রদেশের এক শান্ত কোণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই দ্বীপ নতুন করে আলোচনায় এসেছে একজন সাধারণ মানুষের কারণে। নাম তার ট্রান ভ্যান তুয়ান। পেশায় রাস্তার আইসক্রিম বিক্রেতা, অথচ কাজের মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছেন হোন সন দ্বীপের নীরব পর্যটন দূত।

তুয়ানের গল্প আসলে মানুষের গল্প। যেখানে ব্যবসার চেয়েও মানুষের আনন্দ বড়, আর লাভের চেয়েও স্মৃতি বেশি মূল্যবান।

স্মার্টফোনেই গড়ে ওঠা পেশাদার ভিডিওগ্রাফার 

হোন সন দ্বীপে বেড়াতে আসা অনেক পর্যটকই চান সুন্দর ছবি বা ভিডিও নিয়ে ফিরতে। কিন্তু সঠিক অ্যাঙ্গেল, আলো কিংবা মুহূর্ত ধরতে না পারায় সেই ইচ্ছা অনেক সময় অপূর্ণ থেকে যায়। এই জায়গাতেই তুয়ান আলাদা। কোনো দামি ক্যামেরা বা ড্রোন ছাড়াই, শুধু স্মার্টফোন হাতে নিয়ে তিনি এমন মসৃণ ও প্রাণবন্ত ভিডিও ধারণ করেন যা দেখে অনেকেই অবাক হন।

উঁচু পাহাড় থেকে ধীরে নিচে নামা প্যানিং শট, সমুদ্রের ধারে হাঁটতে থাকা মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত হাসি কিংবা সূর্যাস্তের নরম আলো—সবকিছুই তার ভিডিওতে ধরা পড়ে স্বাভাবিক ছন্দে। গত তিন থেকে চার বছর ধরে তিনি এই কাজ করে যাচ্ছেন একেবারে নিজের ইচ্ছায়। তার ভাষায়, একজন দ্বীপবাসী হিসেবে তিনি সব সুন্দর জায়গা চেনেন, আর সেই সৌন্দর্য অন্যদের স্মৃতিতে তুলে ধরতে পারাই তার আনন্দ।

১৯৮৪ সাল থেকে চলে আসা পারিবারিক আইসক্রিমের ঐতিহ্য

ভিডিও ধারণের আড়ালে তুয়ানের মূল পরিচয় একজন আইসক্রিম বিক্রেতা। এই পেশা তার পরিবারের। তার বাবা ১৯৮৪ সালে হোন সন দ্বীপে হাতে তৈরি আইসক্রিম বিক্রি শুরু করেন। সেই রেসিপিই আজও ব্যবহার হচ্ছে। দুধ, চিনি, নারকেলসহ প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে প্রতিটি ব্যাচ তৈরি করতে সময় লাগে দশ ঘণ্টারও বেশি।

বাই বাং সৈকত কিংবা ‘নামহীন জলপ্রপাত’ এলাকার আশপাশে তুয়ানের আইসক্রিমের গাড়ি এখন পরিচিত দৃশ্য। নারকেল, ডুরিয়ান, চকোলেট কিংবা লাল বিন—বিভিন্ন স্বাদের আইসক্রিম মাত্র ১০,০০০ ভিয়েতনামি ডংয়ে পাওয়া যায়। অনেক সময় পর্যটকদের ভিডিও করতে গিয়ে তিনি বিক্রি করতেই ভুলে যান। তবু তার মুখে হাসি থাকে, কারণ মানুষ খুশি হলেই তিনি তৃপ্ত।

হোন সন দ্বীপ: আন গিয়াংয়ের লুকানো রত্ন

মাত্র ১১ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত হোন সন দ্বীপে রয়েছে ছয়টি মনোরম সৈকত। স্বচ্ছ জল, পাহাড়ি প্রাকৃতিক দৃশ্য আর তাজা সামুদ্রিক খাবার এই দ্বীপের মূল আকর্ষণ। বাই বাং সৈকতে সাঁতার কাটা, মা থিয়েন লান শৃঙ্গে উঠে সূর্যোদয় দেখা কিংবা থিয়েন টিউ মার্কেটে সাশ্রয়ী দামে তাজা সামুদ্রিক খাবার উপভোগ—সব মিলিয়ে এটি একেবারে অনুসন্ধানধর্মী ভ্রমণ গন্তব্য।

দ্বীপ ভ্রমণের সেরা সময় মে থেকে অক্টোবর। এই সময় আবহাওয়া অনুকূল থাকে এবং প্রকৃতিও থাকে প্রাণবন্ত।

মানুষের আন্তরিকতাই আসল আকর্ষণ

হোন সন দ্বীপের সৌন্দর্য পর্যটকদের টানে ঠিকই, তবে মানুষই তাদের ফিরিয়ে আনে বারবার। ট্রান ভ্যান তুয়ানের মতো মানুষদের আন্তরিকতা এই দ্বীপকে আলাদা পরিচয় দেয়। একজন সাধারণ আইসক্রিম বিক্রেতা যখন নিঃস্বার্থভাবে অন্যের স্মৃতি সুন্দর করে তুলতে চান, তখন সেই জায়গাটি আর শুধু পর্যটন স্পট থাকে না—তা হয়ে ওঠে অনুভবের অংশ।

হোন সন দ্বীপ থেকে পর্যটকরা যখন বিদায় নেন, তারা সঙ্গে নিয়ে যান শুধু ছবি বা ভিডিও নয়, বরং মানুষের ভালোবাসা আর আন্তরিকতার গল্প। আর সেই গল্পের নেপথ্যে নীরবে কাজ করে যান ট্রান ভ্যান তুয়ানের মতো মানুষরা, যারা নিজের শহরকে পরিচিত করে তুলছেন হৃদয়ের ভাষায়।

প্রতিবেদক : ইসলাম রাইসুল

Read Previous

সুন্দরবনের গভীরে নিরাপদ আরামদায়ক ভ্রমণের নতুন ঠিকানা: বনলতা ইকো রিসোর্টের বিশেষ প্যাকেজ

Read Next

আলো, সংগীত আর নতুন আশার গল্প: বিশ্বজুড়ে ২০২৬ ইংরেজি নববর্ষ বরণের বৈশ্বিক উৎসব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular