
ফাইল ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি বনভূমির গভীরে লুকিয়ে থাকা মায়াবী ঝর্ণা এখন এমন এক জায়গা, যেখানে গেলে মনে হয় শহুরে জীবন হঠাৎ থেমে গেছে, আর প্রকৃতি নিজের মতো করে মানুষের মনকে শান্ত করে দিচ্ছে। এই ঝর্ণার নামটা যেমন কোমল, সৌন্দর্যটাও ঠিক তেমনই মোহজাগানিয়া। পাহাড়, সবুজ গাছপালা, পাথরের দেয়ালে আছড়ে পড়া সাদা পানির ঝাপটা—সব মিলিয়ে মায়াবী ঝর্ণা এমন এক অভিজ্ঞতা দেয় যা সত্যিকার অর্থে অনেকের মনেই রহস্য আর মায়া তৈরি করে। সীতাকুণ্ডের ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায় যে এই পাহাড়ি অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে মানুষের টান ধরে রেখেছে। পাহাড়, ঝরনা আর বনের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সম্পর্ক বহু পুরোনো। বৌদ্ধ ঐতিহ্য, হিন্দু তীর্থস্থান, পাহাড়ি পথ ধরে পুরোনো বাণিজ্যের চলাচল—সব মিলিয়ে সীতাকুণ্ড বরাবরই ছিল সংস্কৃতির মিলনস্থল। মায়াবী ঝর্ণার কোনো লিখিত ইতিহাস না থাকলেও স্থানীয় গল্পে শোনা যায় যে প্রাচীন পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ঝর্ণাগুলোকে পবিত্র মনে করত। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ঝরনার পানি পাহাড়ের আত্মা বহন করে। আর এই বিশ্বাসই হয়তো সময়ের সঙ্গে মিলেমিশে এমন নাম দিয়েছে—মায়াবী।
ঝর্ণার সৌন্দর্য কাছ থেকে না দেখলে বোঝা যায় না। পাহাড়ের বুকে যেন এক সরু সিঁড়ি কেটে পানি নিচে নেমে আসছে। মায়াবী ঝর্ণার দুটি ধাপ আছে—প্রথমটি চওড়া আর তুলনামূলক নিচু; এখানে পানি পড়ে তৈরি করে ছোট এক প্রাকৃতিক পুকুরের মতো জায়গা। দ্বিতীয় ধাপটি সরু, অনেক উঁচু আর নিচের দিকে খাড়া। এই দুই ধাপ মিলিয়ে ঝরনাটা ঠিক যেন পাহাড়ি শিল্পী হাতে আঁকা। পানির ফোঁটা যখন রোদের আলোয় ঝিলমিল করে, তখন পুরো ঝরনাটা মনে হয় কুয়াশায় ঢাকা। বিশেষ করে দুপুরের রোদ যখন একটু তির্যক হয়ে পড়ে, তখন আলো আর পানির মিশ্রণ তার নামের সঙ্গে মেলে যায়—মায়ার মতোই নরম আর অদ্ভুত। বর্ষায় ঝরনার শক্তি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। পাহাড়জুড়ে তখন পানির ধারা চলতে থাকে ঘন শব্দে। আর সেই শব্দই তৈরি করে এক ধরনের শুদ্ধ নীরবতা—যেখানে শুধু প্রকৃতিই কথা বলে।
মায়াবী ঝর্ণার চারপাশের রাস্তা ধরে হাঁটলেই বোঝা যায় সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি গ্রামের জীবন কেমন ছিল। ঝরনার পথে ছোট ছোট বাঁশবন, লতাপাতা ঘেরা সরু পথ, কিছু কাঁচা বাড়ি আর মাঝেমধ্যে দেখা পাওয়া যায় স্থানীয় কৃষকদের। তাদের হাসিমুখ, কৌতূহলী দৃষ্টি আর সহজ-সরল কথাবার্তা পুরো ভ্রমণটাকে আরও মানবিক করে তোলে। সীতাকুণ্ডের মানুষেরা অতিথিপরায়ণ। ঝরনার পথে কাউকে জিজ্ঞেস করলে পথ বলে দেবে, কখনো কখনো পাহাড়ি পথ ধরতে সাহায্যও করবে। এ অঞ্চলের সংস্কৃতি মূলত প্রকৃতি–নির্ভর। বাঁশ, ফলজ গাছ, বনজ সম্পদ, চা–পাতা—এসবই স্থানীয় জীবনের দীর্ঘদিনের সঙ্গী। এমনকি ঝরনার কাছাকাছি অনেক গাছের বয়সও বেশ পুরোনো, যা পরিবেশগত দিক থেকে জায়গাটিকে আরও মূল্যবান করে তুলেছে।
প্রকৃতিপ্রেমীরা এখানে গেলে বুঝবে জায়গাটা শুধু পর্যটন স্পট নয়—এটা জীবন্ত এক ইকোসিস্টেম। প্রজাপতি, পাখি, পাহাড়ি ঝোপঝাড় আর নানান ধরনের বনজ উদ্ভিদ মিলে পুরো এলাকা যেন এক প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য। ঝরনার পানি এত স্বচ্ছ যে নিচের পাথরগুলোও পরিষ্কার দেখা যায়। অনেক সময় দেখা যায় পানির ওপর পাতার ছায়া পড়ে ছোট ছোট নকশা তৈরি হয়েছে। ঝরনার পথ ধরে পেছনে তাকালে পাহাড়ের সবুজ স্তরগুলো এমনভাবে সাজানো যে মনে হয় কোনো শিল্পী সচেতনভাবে রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে।
এখানে যাওয়ার পথও পর্যটকদের কাছে আরেক রকম অভিজ্ঞতা। ঢাকা বা চট্টগ্রাম—দু জায়গা থেকেই সীতাকুণ্ডে পৌঁছানো সহজ। ঢাকা থেকে যেকোনো চট্টগ্রামগামী বাসে উঠে সীতাকুণ্ড বাজারে নেমে সেখান থেকে সিএনজি কিংবা অটোরিকশায় নেওয়া যায় ঝরনার প্রবেশমুখ পর্যন্ত। ভাড়া সাধারণত ২০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে। ঝরনার প্রকৃত সৌন্দর্য পেতে হলে হাঁটতে হয় প্রায় আধা থেকে এক ঘণ্টা। এই পথ কিছু জায়গায় মসৃণ, কিছু জায়গায় পাথর, আবার কিছু জায়গায় চড়াই। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে এই পথটাই বেশি আকর্ষণীয়। তবে যাদের পথচলার অভ্যাস কম, তারা চাইলে স্থানীয় গাইড নিতে পারেন। গাইড সাধারণত ২০০–৪০০ টাকায় পাওয়া যায়। গাইড থাকলে পথ নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে না, আর ভ্রমণটাও আরও স্বচ্ছন্দ হয়।
খরচ মোটামুটি সাশ্রয়ী। ঢাকাগামী বাসভাড়া ৬০০–১২০০ টাকায় পাওয়া যায়। সীতাকুণ্ডে এসে স্থানীয় পরিবহনের খরচ আর গাইড মিলিয়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকার মতোই লাগে। খাবারের দামও খুব বেশি নয়। বাজারে ১৫০–২৫০ টাকায় ভালো মানের খাবার খাওয়া যায়। ঝরনার পথে কোনো বড় দোকান না থাকায় পানি আর হালকা নাস্তা সঙ্গে নেওয়া ভালো। পর্যটকের চাপ বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসন এখন এলাকা পরিষ্কার রাখার উদ্যোগ নিয়েছে, তাই প্লাস্টিক বা অপ্রয়োজনীয় কিছু ফেলে না যাওয়াই উচিত।
থাকার ব্যবস্থা নিয়ে অনেকেই ভাবেন—আসলে এখানে রাত কাটাতে চাইলে সীতাকুণ্ড বাজারের ছোট লজগুলোই যথেষ্ট। ভাড়া ৪০০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে। তবে আরামদায়ক পরিবেশ চাইলে চট্টগ্রাম শহরে থাকা ভালো। চট্টগ্রাম থেকে সীতাকুণ্ডের দূরত্ব খুব বেশি নয়, তাই ঘুরে এসে সন্ধ্যায় শহরে ফিরে থাকার সুবিধা আছে। অনেক পর্যটকই দিনভর মায়াবী ঝর্ণা, খৈয়াছড়া ঝরনা, চন্দ্রনাথ পাহাড়—এসব দেখে রাতে শহরে গিয়ে থাকে। এতে নিরাপত্তা এবং খাবারের বিষয়গুলোও সহজ হয়।
নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ কিছু কথা বলাই ভালো। ঝরনার কাছে পাথর পিচ্ছিল থাকতে পারে। তাই স্যান্ডেল বা স্লিপার নয়, গ্রিপ ভালো এমন জুতো পরা দরকার। বর্ষায় পানি বাড়লে ঝরনার নিচে খুব বেশি নামা উচিত নয়। অনেক সময় প্রবাহ দেখে বোঝা যায় না নিচে কোথায় গভীরতা আছে। দলবেঁধে গেলে একে অপরকে চোখের আড়াল করা ঠিক নয়। আর অবশ্যই পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে সচেতন থাকা জরুরি। পাহাড়ি এলাকা নোংরা হলে সেই ক্ষতি দ্রুত সারানো যায় না। তাই সবাই একটু দায়িত্ব নিলে জায়গাটা সুন্দর থাকবে বহু বছর।
পর্যটনের কারণে স্থানীয় মানুষের জীবনও বদলাচ্ছে। গাইড, সিএনজি চালক, চা–দোকানি—সবাই ঝরনা–ভিত্তিক আয় থেকে উপকৃত হচ্ছে। এর ফলে এলাকার অর্থনীতি উন্নত হচ্ছে। প্রশাসনও ধীরে ধীরে উন্নয়ন কাজ এগিয়ে নিচ্ছে—পর্যটকদের জন্য দিকনির্দেশনা বোর্ড, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, রাস্তা মেরামত—এসব কাজ চলমান রয়েছে।
সব মিলিয়ে মায়াবী ঝর্ণা এখন শুধু একটি জলপ্রপাত নয়; এটা সীতাকুণ্ডের প্রাকৃতিক ধন, ইতিহাসের অংশ, স্থানীয় জীবনের প্রতিচ্ছবি আর ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে এক অনন্য প্রশান্তির জায়গা। এখানে এসে শুধু ঝরনা দেখা নয়; পাহাড়ি বাতাসে শ্বাস নেওয়া, বনভূমির গন্ধ মাখা, পথচলার অনুভূতি—সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটা মানসিকভাবে অনেক সমৃদ্ধ করে। যারা প্রকৃতিকে সত্যিকার অর্থে অনুভব করতে চান, তাদের তালিকায় মায়াবী ঝর্ণা থাকবেই। এখানে আসে মানুষ ক্লান্তি ভোলার জন্য, কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়ানোর জন্য, আর প্রকৃতির বুকে হাত রেখে নিজের ভিতরের শান্তিটুকু খুঁজে পাওয়ার জন্য।
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ



