
ফাইল ছবি
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : শীতের আমেজ ঠিকমতো বসতেই দেশের পর্যটন শিল্প চোখে পড়ার মতোভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠছে। হোটেল, রিসোর্ট, ক্রুজ অপারেটর থেকে শুরু করে হাউসবোট মালিক—সবাইই এই মৌসুমে পর্যটকদের আকর্ষণ করতে হাত খুলে দিচ্ছে নানা ছাড় আর বিশেষ প্যাকেজ। অনেক স্থানে ছাড়ের পরিমাণ ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
ভ্রমণে ফের ভরসা ফিরছে
গত বছর রাজনৈতিক উত্তেজনা আর নিরাপত্তা সংকটের কারণে পর্যটকের সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ কম ছিল। এবার পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক হওয়ায় ভ্রমণ ব্যবসায়ীরা নতুন করে গতি পাওয়ার প্রত্যাশায় আছেন। দেশের অভ্যন্তরীণ গন্তব্যগুলোতে আগ্রহ বাড়ছে, বিশেষ করে শীতপ্রধান পর্যটন অঞ্চলগুলোতে বুকিংয়ের গতি দ্রুত বাড়ছে।
সিলেট–শ্রীমঙ্গল: ডিসকাউন্টে চায়ের দেশের আমন্ত্রণ
চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলের রিসোর্টগুলো যেন ছাড়যুদ্ধে নেমেছে। সপ্তাহের দিন কিংবা সপ্তাহান্ত—দুই ক্ষেত্রেই দারুন সব অফার মিলছে। গ্র্যান্ড সুলতান ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো মূল্যে এগিয়ে থাকলেও বালিশিরা রিসোর্ট এবং নভেম ইকো রিসোর্ট ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে।
এখানে প্রায় ২০০টির মতো হোটেল-মোটেল আছে, অনেকই বিশেষ প্যাকেজ, হানিমুন অফার, কিংবা গ্রুপ ট্রাভেল ডিসকাউন্ট দিচ্ছে।
তবে সবকিছুর মাঝেও সিলেট নিয়ে সংশ্লিষ্টদের দুশ্চিন্তা কম নয়। ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের দীর্ঘদিনের সংস্কারকাজ যাতায়াতকে অনেক ধীর করে ফেলেছে। আগে যেখানে চার থেকে ছয় ঘন্টা লাগত, এখন তা ১৬ থেকে ১৮ ঘন্টায় গিয়ে ঠেকছে। বিমানভাড়া বাড়া এবং ট্রেন টিকিটের সীমাবদ্ধতাও পর্যটকদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। স্থানীয় হোটেল মালিকরা সতর্ক করে বলছেন—পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে মৌসুমের সুফল পুরোপুরি পাওয়া নাও যেতে পারে।
সাজেক–রাঙামাটি: মেঘের রাজ্যে ছুটির ভিড়
সাজেক ভ্যালি আগের বছরের মতোই পর্যটকের কাছে শীর্ষ পছন্দ। রিসোর্টগুলো ২০–৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে। মেঘকাব্য, মেঘপল্লীর মতো নামি রিসোর্টগুলো আগে থেকেই বুকিং নিতে ব্যস্ত।
এদিকে রাঙামাটির অন্যান্য স্পটেও ভ্রমণপ্রেমীরা বাড়তি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনও মৌসুমী অফার ঘোষণা করেছে—তাদের নিজস্ব মোটেলে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় রাখা হয়েছে।
কক্সবাজার: অফার আছে, ভিড় আছে, দামও বাড়তে পারে
প্রায় ৪৫০টির বেশি হোটেল ও রিসোর্ট নিয়ে দেশের বৃহত্তম পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজার ব্যস্ত সময় পার করছে। ২০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় রাখা হলেও ডিসেম্বর ঘনিয়ে এলে দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে অপারেটররা জানিয়েছেন।
হোটেল মালিকরা বলছেন, গত মৌসুমে কক্সবাজার তুলনামূলক ভালো ব্যবসা করেছে। তাই এই মৌসুমে আরও ভালো সাড়া পাওয়ার আশা তারা করছেন।
সেন্ট মার্টিন: সীমাবদ্ধতা থাকলেও আগ্রহ বাড়ছেই
সেন্ট মার্টিনে এখনো প্রতিদিন ২০০০ দর্শনার্থীর সীমা আছে। নভেম্বরজুড়ে কেবল দিনের সফর করা যাবে, ডিসেম্বর থেকে আবার রাত্রিযাপনের অনুমতি ফিরে আসবে। সীমিত ধারণক্ষমতার কারণে দ্বীপের আবাসনগুলো প্রিমিয়াম রেটে চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সুন্দরবনের ক্রুজ ব্যবসায় উত্সাহ
মৌসুমের শুরু থেকেই সুন্দরবনের ক্রুজ ট্যুরে ভালো সাড়া মিলছে। প্রায় ৬০টি ক্রুজ অপারেটর দুই রাত তিন দিনের প্যাকেজ দিচ্ছে, যার মূল্য ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে।
ডিসেম্বরের ক্রুজগুলোর ৯০ শতাংশ বুকিং ইতিমধ্যেই পূরণ বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
হাউসবোট ট্যুরও জনপ্রিয়তার শীর্ষে। টাঙ্গুয়া হাওর, কাপ্তাই হ্রদ, পদ্মা নদী—যেখানেই যান না কেন, বিভিন্ন বাজেটের বিকল্প রয়েছে। টাঙ্গুয়ায় ৪ হাজার থেকে ১২ হাজার, কাপ্তাইয়ে ৩ হাজার থেকে ৮৫০০ এবং পদ্মায় ১৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকায় দলগত ভ্রমণ সম্ভব। অপারেটররা বলছেন, বর্ষায় ভ্রমণ কম হলেও শীতে তারা পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
বিদেশি পর্যটন এখনো পিছিয়ে
দেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে না বললেই চলে। ট্যুর অপারেটররা বলছেন, ভ্যাট ১৫ শতাংশ থাকা, দক্ষ গাইড কম পাওয়া এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি—সব মিলিয়ে বিদেশিরা বেশ সতর্ক।
অনেকে উল্লেখ করেছেন, মুনাফা গত বছরের তুলনায় আরও কমে গেছে। তাদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কর-সংক্রান্ত কিছু বাধা কমানো গেলে বিদেশিদের সংখ্যা আবার বাড়তে পারে।
নির্বাচন সামনে, ব্যবসায়ীদের মিশ্র উদ্বেগ
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন সামনে থাকায় হোটেল–রিসোর্ট মালিকরা একদিকে আশাবাদী, অন্যদিকে শঙ্কায়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে প্রবাসী, সাংবাদিক, পর্যবেক্ষকসহ বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতি বাড়তে পারে। আর অস্থিরতা দেখা দিলে পুরো মৌসুমই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।



