
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর হিথরো এবার এক ব্যতিক্রমী দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছে। টার্মিনাল ৪–এর ইমিগ্রেশন কাউন্টারের ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ডে প্রথমবারের মতো বাংলায় দিকনির্দেশনা দেখা গেছে। ইংরেজি, আরবি, হিন্দিসহ আরও কয়েকটি ভাষার সঙ্গে বাংলার উপস্থিতি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আনন্দ আর গর্ব ছড়িয়ে দিয়েছে।
বুধবার প্রদর্শিত সেই বার্তায় যাত্রীদের উদ্দেশে লেখা ছিল, অনুগ্রহ করে আপনার পাসপোর্টটি প্রস্তুত রাখুন এবং ওয়ালেট বা হোল্ডার থেকে বের করুন। সাধারণ নির্দেশনা হলেও এর বাংলা অনুবাদ যুক্ত হওয়া প্রবাসীদের কাছে অর্থবহ হয়ে উঠেছে। অনেকেই বলছেন, এটি শুধু একটি বার্তা নয়—এটি যুক্তরাজ্যে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের অবদান ও উপস্থিতির স্বীকৃতি।
স্থানীয় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকেরা জানাচ্ছেন, গত কয়েক দশকে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটি শুধু বড়ই হয়নি, বরং সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অবদান রেখেছে। হিথরোতে বাংলার ব্যবহার সেই দীর্ঘ পথচলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন।
আজিজুল ইসলাম খান নামে একজন কমিউনিটি সদস্য বলেন, হিথরোতে বাংলার উপস্থিতি আমাদের পরিচিতিকে নতুন মর্যাদা দিয়েছে। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাজ্যে আমরা আছি, কাজ করছি, পরিবার গড়েছি। এখন সেই ইতিহাস আন্তর্জাতিক একটি স্থাপনায় ভাষার স্বীকৃতি হিসেবে জায়গা পেল।
হিথরোতে বাংলার ব্যবহার নতুন হলেও পূর্ব লন্ডন বহুদিন ধরেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। টাওয়ার হ্যামলেটসে ইতোমধ্যেই রাস্তার নাম, সাইনবোর্ড, জনসাধারণের নির্দেশনায় বাংলার ব্যবহার বেশ সাধারণ দৃশ্য। ব্রিকলেন, বুক্সটন স্ট্রিট, ফুর্নিয়ার স্ট্রিটসহ বহু স্থানে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা লেখা রয়েছে।
২০২২ সালে হোয়াইটচ্যাপল পাতাল রেলস্টেশনের প্রবেশপথে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় ‘হোয়াইটচ্যাপল স্টেশন’ লেখা হওয়াও স্থানীয়দের মধ্যে উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার বাংলার উপস্থিতি পৌঁছে গেল আন্তর্জাতিক গেটওয়ে হিথরো বিমানবন্দরে।
বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখতে এসব এলাকার বিভিন্ন স্থানে স্থায়ী শহীদ মিনার স্থাপন করা হয়েছে। লন্ডন, বার্মিংহাম, ওল্ডহামসহ যুক্তরাজ্যের নানা জায়গায় রয়েছে কমপক্ষে আটটি স্থায়ী শহীদ মিনার। পূর্ব লন্ডনের আলতাব আলী পার্ক তো বহু বছর ধরেই প্রবাসীদের স্মৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতীকী স্থান হিসেবে পরিচিত।
এ ছাড়া কমিউনিটির উদ্যোগে বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছে বাংলা ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে তুলে ধরে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাইমারি স্কুল, ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন কিংবা রবীন্দ্রনাথ–নজরুলের নামে স্কুল—এসবই প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, যুক্তরাজ্যের সমাজে বাংলাদেশি পরিচয় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হিথরো বিমানবন্দরে বাংলার অন্তর্ভুক্তি শুধু ভাষার মর্যাদা নয়—এটি বহুসংস্কৃতিকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্রিটিশ নীতিরই অংশ। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর বাড়তে থাকা সংখ্যার প্রতিফলন।
কমিউনিটির প্রতিনিধিদের ভাষায়, বাংলার এই দৃশ্যমানতা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। কারণ বাংলাদেশি অভিবাসীরা এখন শুধু শ্রমনির্ভর সেক্টরেই নয়, শিক্ষা, ব্যবসা, রাজনীতি, স্বাস্থ্যসেবা—সব ক্ষেত্রেই নিজের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
সব মিলিয়ে হিথরোর এই ছোট্ট পরিবর্তন প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে বড় একটি অর্জনের মতো অনুভূত হচ্ছে। নিজের মাতৃভাষায় নির্দেশনা দেখে ক্লান্ত ভ্রমণকারীদের চোখে যে হাসি দেখা যায়, তা যেন বলে দেয়—বিশ্বের এক প্রান্তেও বাংলা আজ আর অপরিচিত নয়।



