রন্ধনশিল্পে দক্ষতা: বাংলাদেশি তরুণদের বৈশ্বিক চাকরির নতুন দুয়ার

ছবি: সৌজন্য

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : একসময় যেটি ছিল কেবল শখের বিষয়, এখন সেটিই হয়ে উঠছে অনেক তরুণের পেশা ও অভিবাসনের পথ—রন্ধনশিল্প বা কুলিনারি আর্টস। দেশজুড়ে গড়ে ওঠা প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো আজ নতুন প্রজন্মের সামনে খুলে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক চাকরির দরজা।

খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য বলছে, প্রতিবছর প্রায় আট হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন কুলিনারি ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক পাস করেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মালয়েশিয়া, দুবাই, কাতার কিংবা ইউরোপের দেশগুলোতে কাজের সুযোগ পান।

পরিবর্তনের সূচনা

এক দশক আগেও বাংলাদেশে পেশাদার শেফ হওয়ার স্বপ্ন দেখার মতো অবকাঠামো ছিল না। বেশিরভাগ আগ্রহী তরুণ হোটেল বা রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে সহকারী হিসেবে কাজ শিখতেন। এখন দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটজুড়ে এখন রয়েছে একাধিক স্বীকৃত রন্ধনশিল্প প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদনে এসব প্রতিষ্ঠানে ফুড প্রোডাকশন, পেস্ট্রি অ্যান্ড বেকারি, ফ্রন্ট অফিস, হাউসকিপিং এবং আন্তর্জাতিক কুলিনারি ডিপ্লোমার মতো বিষয় পড়ানো হয়।

সরকারি পর্যায়ে প্রধান প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (এনএইচটিটিআই) প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ নেন, যার মধ্যে ছয় শতাধিক কুলিনারি কোর্সে যুক্ত। এছাড়া বেসরকারি খাতেও দ্রুত বাড়ছে দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগ।

নতুন প্রজন্মের আগ্রহ

রাজধানীর ধানমন্ডির একটি কুলিনারি ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন তরুণ আশিক রহমান। তিনি বললেন, “বিদেশে পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ করতে চাই। রান্না শিখলে সেই সুযোগ অনেক বেড়ে যায়। এখন শুধু ভালো রান্না জানলেই হয় না, পরিচ্ছন্নতা, উপস্থাপন, টিমওয়ার্ক—সব কিছুতে দক্ষ হতে হয়।”

আশিকের মতো অনেকেই এখন রন্ধনশিল্পকে কেবল রান্নার সীমায় রাখছেন না, বরং এটি দেখছেন ক্যারিয়ার গঠনের বাস্তব বিকল্প হিসেবে।

আন্তর্জাতিক সুযোগের বিস্তার

বাংলাদেশি-প্রবাসী উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে দেশে ফিরছে বিদেশি মানের কুলিনারি শিক্ষা। ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক কুলিনারি একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা শেফ রায়হান কবির জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে ছয় মাস ও এক বছরের দুটি ডিপ্লোমা কোর্স চালু আছে।
তাঁর ভাষায়, “আমরা শিক্ষার্থীদের শুধু রান্না শেখাই না, বরং বিদেশে ইন্টার্নশিপ ও চাকরির সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করি। অনেকেই এখন যুক্তরাষ্ট্রের ইবি-৩ ভিসা বা জি-১ পেইড ইন্টার্নশিপের আওতায় যাচ্ছেন।”

তাঁদের তিন মাসের সার্টিফিকেট কোর্সের ফি প্রায় ৬৫ হাজার টাকা, আর এক বছরের ডিপ্লোমার খরচ সাড়ে চার লাখ টাকার মতো। প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষার্থীরা বিদেশি হোটেল চেইনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন।

রায়হান বলেন, “রান্না এখন বৈশ্বিক ভাষা। একজন দক্ষ শেফের জন্য দেশ, সংস্কৃতি বা জাতীয়তা কোনো বাধা নয়—যদি তার কাজে শৃঙ্খলা আর নিখুঁততা থাকে।”

অভিবাসনের বিকল্প পথ

সরকারও বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ‘শেফ’ ও ‘বেকার’ পেশাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দক্ষ অভিবাসনের বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করে। ফলে এখন কুলিনারি ডিপ্লোমা সম্পন্ন শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে স্বীকৃত সনদ দেখিয়ে চাকরির আবেদন করতে পারছেন।

ন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষক সাইফুল ইসলাম বললেন, “আগে শিক্ষার্থীরা মূলত দেশেই চাকরির কথা ভাবত। এখন অন্তত অর্ধেক শিক্ষার্থী বিদেশে কাজের লক্ষ্য নিয়ে ভর্তি হয়। রন্ধনশিল্প এখন অনেকের কাছেই অভিবাসনের টেকসই পথ।”

আত্মনির্ভরতার গল্প

মিরপুরের তরুণী নাবিলা হোসেন দুই বছরের ডিপ্লোমা শেষ করে দুবাইয়ের একটি হোটেলে ইন্টার্নশিপ শেষে দেশে ফিরে এখন নিজস্ব ক্যাটারিং ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাঁর মতে, “এই প্রশিক্ষণ শুধু চাকরির সুযোগ দেয়নি, আমাকে উদ্যোক্তা হতে শিখিয়েছে। আত্মবিশ্বাসই এখানে সবচেয়ে বড় বিষয়।”

নাবিলার মতো অনেকেই দেশে ফিরে নিজেদের উদ্যোগে ক্যাফে বা বেকারি খুলছেন। এতে স্থানীয় পর্যায়েও কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আতিথেয়তা খাতে প্রায় পনেরো লাখ মানুষ কাজ করছেন, যাঁদের বড় অংশই প্রশিক্ষিত রন্ধনকর্মী।

সামনে যে চ্যালেঞ্জ

তবে সবকিছু এত সহজ নয়। এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই, ফলে তাদের সনদ বিদেশে সবসময় গ্রহণযোগ্য হয় না। প্রশিক্ষণের খরচও অনেকের নাগালের বাইরে—দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের ফি সাধারণত তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত।

শিক্ষক ও উদ্যোক্তাদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। একটি জাতীয় কুলিনারি পাঠ্যক্রম গড়ে তোলা দরকার, যা আন্তর্জাতিক মান যেমন ব্রিটিশ ‘সিটি অ্যান্ড গিল্ডস’ বা আমেরিকান কুলিনারি ফেডারেশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ

রন্ধনশিল্প এখন আর শুধু পেশা নয়—এটি বাংলাদেশের তরুণদের জন্য বৈশ্বিক দরজায় প্রবেশের নতুন চাবিকাঠি। খাবারের চাহিদা কখনো ফুরায় না, আর রান্নার শিল্প শেখা মানে জীবনের জন্য একটি দক্ষতা অর্জন করা।

যেমনটা শেফ রায়হান কবিরের ভাষায়, “আপনি যখন কাউকে ভালোভাবে রান্না শেখান, তখন আসলে তাকে শুধু একটা চাকরি নয়, বরং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তিটা দেন।”

বাংলাদেশের তরুণদের হাতে সেই শক্তিটাই এখন গড়ে উঠছে—রান্নাঘর থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত।

Read Previous

রেডিসন ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনে ব্র্যাক ব্যাংক কার্ডধারীদের জন্য “১ কিনলে ৩ ফ্রি” সীফুড ফেস্টিভ্যাল

Read Next

একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট: জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের নতুন রোডম্যাপ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular