
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : রাঙামাটির পাহাড়ি প্রকৃতি যেন এবার নতুন রঙে সেজেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বৈসাবি উৎসবকে ঘিরে রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে জমে উঠেছে বর্ণিল মেলা। মঙ্গলবার মেলার দ্বিতীয় দিনে বিকেল গড়াতেই প্রাঙ্গণ কানায় কানায় ভরে উঠে। হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। তরুণ-তরুণীরা নানা রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে উৎসবে যোগ দিয়েছেন। তাদের হাসি-খুশি আর উৎসাহে পুরো পরিবেশ হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত।
পার্বত্য অঞ্চলের ১০টি ভাষাভাষী ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসাবি। এবারের আয়োজনে ছিল ব্যাপক উদ্যম ও নতুনত্ব। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, চাক, পাংখোয়া, লুসাই, খুমী ও খিয়াং সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, স্বাদু খাবার ও হস্তশিল্পের নানা সামগ্রী স্থান পেয়েছে মেলায়। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি মাচাঙ ঘরের আদলে সাজানো হয়েছে আকর্ষণীয় স্টলগুলো। প্রতিটি স্টলে দর্শনার্থীরা ঘুরে ঘুরে দেখছেন পাহাড়ি জীবনের ছোঁয়া। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান থেকে আসা শিল্পীরাও যোগ দিয়েছেন এতে, যা মেলার আকর্ষণকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এবারের বৈসাবিতে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। আগে চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাইং, ত্রিপুরাদের বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু এবং আহমিয়াদের বিহু আলাদাভাবে পালিত হতো। কিন্তু এবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাংক্রান, সাংলান, চাংক্রাই, পাতা এবং বাংলা নববর্ষ উদযাপন। ফলে উৎসবটি শুধু একক সম্প্রদায়ের নয়, বরং সকল পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর যৌথ সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীদের নৃত্য ও সঙ্গীত পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে রেখেছে। নুপুরের ছন্দ, বাঁশির সুর আর ঢোলের তালে ভিড় জমছে হাজারো দর্শনার্থীর। এই উৎসব পাহাড়ি-বাঙালি, সকল ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে। সবাই একসঙ্গে গান গাইছেন, নাচছেন এবং আনন্দ উপভোগ করছেন।
রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক জিতেন চাকমা বলেন, “পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করতে এই বৈসাবি উৎসবের আয়োজন। আধুনিকতার প্রভাবে যাতে আমাদের ঐতিহ্য হারিয়ে না যায়, সেজন্য মেলায় বিভিন্ন প্রদর্শনীর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নতুন প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।” তিনি আরও জানান, এই আয়োজন শুধু উৎসব নয়, বরং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
মেলায় নানা আকর্ষণীয় কর্মসূচি রয়েছে। পিঠা-পুলির আয়োজন দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। শিশু-কিশোরদের জন্য চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, খেলাধুলা, চাকমা ও ম্রো নাটক, পাচন রান্না প্রতিযোগিতা এবং পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছে। এছাড়া পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনধারা নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনীও দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। প্রতিটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা তাদের দক্ষতা প্রদর্শন করছেন এবং বিজয়ীরা পাচ্ছেন আকর্ষণীয় পুরস্কার।
মেলা প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আব্দুর রকিব জানিয়েছেন, “জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীদের নিরাপদে উৎসব উপভোগ করতে যাতে কোনো অসুবিধা না হয়, সেজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।”
বৈসাবি উৎসব পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। এটি শুধু নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর উৎসব নয়, বরং সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও সাংস্কৃতিক বিনিময়েরও প্রতীক। আধুনিক যুগে ঐতিহ্য সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এ ধরনের মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নতুন প্রজন্ম যাতে তাদের পূর্বপুরুষদের সংস্কৃতি ভুলে না যায়, সেজন্য এই আয়োজন একটি সেতুবন্ধন তৈরি করছে।
দর্শনার্থীরা জানিয়েছেন, এই মেলায় এসে তারা পাহাড়ি জীবনের নিবিড় পরিচয় পাচ্ছেন। একজন বাঙালি দর্শনার্থী বলেন, “প্রতি বছর এই উৎসবে আসি। এখানে এসে মনে হয় সবাই এক পরিবারের সদস্য। নাচ-গান, খাবার, হস্তশিল্প—সবকিছুতেই পাহাড়ের সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে।” অন্যদিকে এক তরুণী চাকমা যুবক বলেন, “আমাদের ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে এই মেলা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্ম এখান থেকে অনেক কিছু শিখতে পারছে।”
এবারের বৈসাবি মেলা শুধু উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি হয়ে উঠেছে পার্বত্য অঞ্চলের সামাজিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পাহাড়ের সবুজ বনানী, কাপ্তাই হ্রদের পাড় এবং রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে এই উৎসব পর্যটকদেরও আকর্ষণ করছে। অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে এসে এই মিলনমেলায় অংশ নিচ্ছেন।
সার্বিকভাবে বলা যায়, রাঙামাটির বৈসাবি মেলা পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরছে। এই উৎসবের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম ঐতিহ্যের ধারক হয়ে উঠছে এবং সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে সেতুবন্ধন আরও মজবুত হচ্ছে। আয়োজকদের প্রচেষ্টায় এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় মেলাটি সফলভাবে চলছে। আগামী দিনগুলোতে আরও বেশি দর্শনার্থী আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ



