
ছবি : সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫, দুপুর ২টা থেকে ঢাকার জামুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র (IVAC) হঠাৎ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কেন্দ্রটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ওই দিন নির্ধারিত সব অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্থগিত থাকবে এবং পরে নতুন তারিখে পুনঃনির্ধারণ করা হবে।
এই সিদ্ধান্তে সাধারণ ভিসা প্রত্যাশীদের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়েছেন চিকিৎসা ভিসার আবেদনকারীরা। কারণ, ভারতের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের চিকিৎসা পর্যটন খাত এবং হাজারো রোগীর চিকিৎসা পরিকল্পনা সরাসরি এই ভিসা প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত।
চিকিৎসা ভিসায় বিলম্ব: স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বাড়তি খরচের শঙ্কা
ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আগাম নির্ধারিত অপারেশন ডেট, কেমোথেরাপি সেশন কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে বহু রোগী অপেক্ষায় ছিলেন। ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব রোগী নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভারতে যেতে পারছেন না।
ফলে গুরুতর রোগে আক্রান্ত অনেক রোগীর চিকিৎসা পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চিকিৎসা বিলম্ব শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই বাড়ায় না, অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে টেস্ট, রিপোর্ট আপডেট কিংবা হাসপাতালের বুকিং বাতিলজনিত অতিরিক্ত খরচও রোগী ও তাদের পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট পুনঃনির্ধারণে আর্থিক ক্ষতি
IVAC জানিয়েছে, ১৭ ডিসেম্বরের সব অ্যাপয়েন্টমেন্ট পরবর্তী সময়ে পুনঃনির্ধারণ করা হবে। তবে বাস্তবে এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে—অনেক আবেদনকারীকে আবার ঢাকায় এসে উপস্থিত হতে হবে। এতে বাড়তি যাতায়াত ব্যয়, হোটেল বুকিং বাতিলের চার্জ এবং অনেক ক্ষেত্রে ফেরত না পাওয়া বিমান টিকিটের ক্ষতি গুনতে হতে পারে।
বিশেষ করে জেলা বা দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের জন্য এই ভোগান্তি আরও বেশি।
জরুরি রোগীদের জন্য বিকল্প পথও কঠিন
অত্যন্ত জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে কেউ কেউ থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর বা চীনের মতো বিকল্প দেশে যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন। কিন্তু এসব দেশের ভিসা প্রক্রিয়া, চিকিৎসা খরচ এবং দ্রুত অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া—সব মিলিয়ে বিষয়টি সহজ নয়। ফলে ভারতের বিকল্প খুঁজে নেওয়াও অধিকাংশ রোগীর জন্য বাস্তবসম্মত সমাধান হয়ে উঠছে না।
শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের সমস্যাও কম নয়
IVAC বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা সময়মতো ভিসা না পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কার্যক্রম, ক্লাস শুরুর তারিখ কিংবা পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন। ব্যবসায়িক ভিসা আটকে গেলে দুই দেশের মধ্যে নির্ধারিত বৈঠক, বাণিজ্যিক চুক্তি কিংবা প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
পর্যটকদের ক্ষেত্রে আগে থেকেই বুক করা হোটেল, ট্যুর প্যাকেজ এবং ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল হওয়ায় সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন অনেকেই।
কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
নিরাপত্তাজনিত কারণে IVAC বন্ধের সিদ্ধান্তটি কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং এর পেছনে কূটনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ধরনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ভিসা প্রক্রিয়ায় আরও কড়াকড়ি বা দীর্ঘসূত্রতার ইঙ্গিত দিতে পারে।
আবেদনকারীদের করণীয় কী
ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—IVAC ও ভারতীয় হাইকমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও নোটিফিকেশন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। ইমেইল ও এসএমএস আপডেট চালু রাখা জরুরি।
যাদের জরুরি চিকিৎসা নির্ধারিত আছে, তারা সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পুনর্নির্ধারণের চেষ্টা করতে পারেন। প্রয়োজনে চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র হালনাগাদ রাখাও বুদ্ধিমানের কাজ। পাশাপাশি যেসব ভিসা ক্যাটাগরিতে ই-ভিসার সুযোগ রয়েছে, সেগুলো যাচাই করাও একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে।
ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রের হঠাৎ বন্ধ হওয়া শুধু একটি দিনের কার্যক্রম স্থগিতের ঘটনা নয়। এটি চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও পর্যটন—সব খাতেই তাৎক্ষণিক ও আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।
এ অবস্থায় আবেদনকারীদের জন্য সচেতন থাকা, অফিসিয়াল তথ্য অনুসরণ করা এবং যেকোনো ভ্রমণ বা চিকিৎসা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগে সর্বশেষ আপডেট যাচাই করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ



