
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ঢাকার পুরান অংশে পা রাখলেই যেন সময় থেমে যায়। সরু গলি, পুরনো ভবন, মসজিদের মিনার আর মানুষের উষ্ণ মুখ—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আবহ। এই পুরান ঢাকাতেই, ৩০ নং সার্কুলার রোডের বালুরঘাট এলাকায় অবস্থিত ‘বিউটি বর্ডিং’। অনেকের কাছে এটি শুধু একটি রেস্তোরাঁ বা পুরনো বাড়ি নয়; এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জাগরণের এক অবিনাশী প্রতীক।
ইতিহাসের শুরু
বিউটি বর্ডিংয়ের ইতিহাস প্রায় সাত দশক পুরনো। পাকিস্তান আমলে, ১৯৫১ সালে শিল্পপতি গোপালচন্দ্র বাগচীর মালিকানায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এটি ছিল মূলত একটি আবাসিক বোর্ডিং হাউস, যেখানে সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা নিয়মিত আড্ডা দিতেন।
এই বর্ডিংয়ের নাম ‘বিউটি’ এসেছে গোপালচন্দ্র বাগচীর মেয়ের নাম থেকে—‘বিউটি বাগচী’। ধীরে ধীরে এটি হয়ে ওঠে পূর্ব বাংলার প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের মিলনস্থল। ষাটের দশক থেকে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত এটি ছিল যেন ঢাকার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র।
ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
বিউটি বর্ডিংয়ের দেয়ালগুলো আজও সাক্ষ্য দেয় অসংখ্য সাহিত্যসভা, কবিতা পাঠ, রাজনৈতিক আলাপ ও সৃষ্টিশীল বিতর্কের। সেখানেই নিয়মিত আসতেন কবি শামসুর রাহমান, সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ, সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, হুমায়ুন আহমেদ, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, আহসান হাবীবসহ আরও অনেকে।
বিশেষ করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় এটি হয়ে ওঠে তরুণ সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের অনুপ্রেরণার স্থান। অনেক গোপন বৈঠকও হয়েছিল এখানে। স্বাধীনতার আগে-পরে বিউটি বর্ডিং ছিল সংস্কৃতি ও রাজনীতির এক মিলনমেলা, যেখানে আলোচনার কেন্দ্র ছিল মুক্তচিন্তা, মানবিকতা আর শিল্পসৃষ্টি।
স্থাপত্য ও পরিবেশ
বিউটি বর্ডিং এখনো তার পুরনো স্থাপত্য ধরে রেখেছে। লাল ইটের দুই তলা ভবন, লোহার গ্রিল, কাঠের জানালা আর মোটা দালানের দেয়াল যেন অতীতের কাহিনি বলে যায়। এর ভেতরে ঢুকলেই এক ধরনের শান্ত নিস্তব্ধতা ঘিরে ধরে—যা নতুন ঢাকায় খুঁজে পাওয়া কঠিন।
চত্বরের মাঝখানে ছোট বাগান, চারপাশে পুরনো চেয়ার-টেবিল, আর দেয়ালে ঝুলে থাকা পুরনো ছবিগুলো যেন সময়কে আটকে রেখেছে। এক কোণে আছে পুরনো রিসেপশন ডেস্ক, যেখানে এখনো বসে থাকে কর্মচারীরা, যাদের অনেকেই বহু বছর ধরে এই জায়গার সঙ্গে যুক্ত।
খাবার ও বর্তমান আকর্ষণ
বর্তমানে বিউটি বর্ডিং মূলত একটি রেস্টুরেন্ট ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে জনপ্রিয়। এখানে পরিবেশন করা হয় ঐতিহ্যবাহী বাংলা খাবার। সকালের নাশতায় পাওয়া যায় পরোটা, ডিম, চা; দুপুরে ভাত, ডাল, ভর্তা, মাছ, মাংস, আর সন্ধ্যায় চা-বিকেলের নাস্তা।
সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো এখানকার চা আর ডিম-পরোটা। দামও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী—প্রতি জনের খাবারের খরচ গড়ে ২০০-৩০০ টাকার মধ্যে। অনেকেই শুধু পুরনো আমেজের জন্য বা ইতিহাসের ছোঁয়া পেতে এখানে আসেন।
কারা আসতেন আর কারা এখন আসেন
একসময় এখানে নিয়মিত আসতেন কবি ও সাংবাদিকরা, যেমন শামসুর রাহমান, শহীদুল্লাহ কায়সার, আহমদ ছফা, হুমায়ুন আজাদ, সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার প্রমুখ। অনেক সাহিত্য পত্রিকার জন্ম হয়েছিল এখানকার টেবিলে বসে।
বর্তমানে এখানে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, বিদেশি পর্যটক, ইতিহাস অনুরাগী, সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী। অনেক সংগঠন ছোট আকারের সাহিত্য সভা বা স্মৃতি অনুষ্ঠানও আয়োজন করে বিউটি বর্ডিং প্রাঙ্গণে।
যাতায়াত ব্যবস্থা
বিউটি বর্ডিংয়ে যাওয়া এখন বেশ সহজ। পুরান ঢাকার বালুরঘাট এলাকায় এটি অবস্থিত, সদরঘাট বা আজিমপুর থেকে সহজেই রিকশা বা সিএনজিতে পৌঁছানো যায়। গুলিস্তান থেকে রিকশায় ভাড়া পড়বে প্রায় ৫০-৭০ টাকা। মেট্রো বা বাসে আসলে গুলিস্তান নামলেই কাছাকাছি রিকশা পাওয়া যায়।
থাকার ব্যবস্থা ও খরচ
বিউটি বর্ডিংয়ের মূল বোর্ডিং অংশ এখন সীমিতভাবে চালু। কয়েকটি কক্ষ এখনও ভাড়া দেওয়া হয় অতিথিদের জন্য। সাধারণ রুম ভাড়া ৮০০-১২০০ টাকার মধ্যে, আর ডাবল রুম প্রায় ১৫০০ টাকার মতো। যদিও অনেকেই এখন শুধু খাবার বা ঘুরে দেখার জন্যই আসেন।
সাংস্কৃতিক ইভেন্ট ও কার্যক্রম
এখানে এখনো মাঝে মাঝে কবিতা পাঠ, সংগীতানুষ্ঠান, বই প্রকাশনা বা স্মরণসভা হয়। কিছুদিন পরপর ঢাকার তরুণ কবিরা ‘বিউটি বর্ডিং কবিতা সভা’ আয়োজন করেন। এছাড়া বাংলা একাডেমি, সাহিত্য সংগঠন কিংবা সাংস্কৃতিক গ্রুপগুলো বিশেষ উপলক্ষে ছোট অনুষ্ঠান করে থাকে।
পর্যটকদের জন্য অভিজ্ঞতা
বিদেশি পর্যটকদের কাছে বিউটি বর্ডিং এখন একধরনের ‘লিভিং মিউজিয়াম’। তারা এখানে এসে বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির বাস্তব স্পর্শ পান। অনেক ভ্রমণকারী বলেন, বিউটি বর্ডিংয়ে বসে চা খাওয়ার অনুভূতি যেন সময়ের ভেতর দিয়ে ভ্রমণের মতো—যেখানে ইতিহাস, মানুষ আর স্মৃতি একসাথে মিশে আছে।
টিকিট বা প্রবেশ ফি
প্রবেশের জন্য আলাদা কোনো টিকিট লাগে না। শুধু রেস্টুরেন্টে খাওয়া বা কফি-চা অর্ডার করলেই সময় কাটানো যায়। ছবি তোলারও অনুমতি আছে, তবে পেশাদার ফটোশুট বা ভিডিওগ্রাফির জন্য আগাম অনুমতি নিতে হয়।
প্রাকৃতিক পরিবেশ ও আশপাশের দর্শনীয় স্থান
বিউটি বর্ডিংয়ের আশপাশে রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক জায়গা—আরমানিটোলা, লালবাগ কেল্লা, হোসেনী দালান, আর সদরঘাট নদীর ঘাট। অনেক পর্যটক বিউটি বর্ডিং ঘুরে এরপর বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে গিয়ে সূর্যাস্ত উপভোগ করেন।
কেন এখনো গুরুত্বপূর্ণ
বিউটি বর্ডিং শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি বাংলাদেশের সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও মুক্তচিন্তার প্রতীক। পুরান ঢাকার ক্রমবর্ধমান কোলাহল আর আধুনিকায়নের মধ্যেও এই জায়গা এখনো ধরে রেখেছে পুরনো সময়ের গন্ধ—যেখানে কলম, কাগজ আর কফির কাপে জন্ম নিতো অনেক বড় ভাবনা।
পুরান ঢাকার বিউটি বর্ডিং এখন ইতিহাসের অংশ, কিন্তু এর প্রাণ এখনো নিভে যায়নি। যারা বাংলাদেশের সংস্কৃতি, সাহিত্য আর ইতিহাস ভালোবাসেন, তাদের জন্য এই জায়গা একবার অন্তত ঘুরে দেখা উচিত। এখানে এসে বোঝা যায়—ঢাকা শুধু ইট-পাথরের শহর নয়, এটি স্মৃতি আর গল্পে ভরা এক জীবন্ত ইতিহাস।



