১০/০৬/২০২৬
২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঈদুল আজহার টানা ছুটিতে প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি মৌলভীবাজারে পর্যটকদের ঢল নামার প্রস্তুতি

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : ঈদুল আজহার পবিত্র উৎসব শেষে টানা ছুটির আমেজে চা-বাগানের সবুজ সমারোহে ঘেরা মৌলভীবাজার জেলা পর্যটনপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর এ জেলায় হোটেল-রিসোর্ট, কটেজ ও গেস্ট হাউসগুলোতে ছুটির আমেজে ভ্রমণপিপাসু মানুষের আগমন ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টরা নিরাপত্তা ও সুবিধা নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। চা-বাগান, জলপ্রপাত, হাওর ও অরণ্যের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটে আসছেন এখানে।

মৌলভীবাজারকে প্রায়ই বলা হয় প্রকৃতির অপূর্ব লীলাভূমি। এখানকার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, রাজনগরসহ বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। ঈদের ছুটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা পর্যটকদের স্বাগত জানাতে শতাধিক রিসোর্ট, পাঁচ তারকা মানের হোটেল ও গেস্ট হাউস প্রস্তুতি নিচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। নতুন করে সাজানো হচ্ছে রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেগুলো। চাইনিজ, থাই এবং স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারের মেনুতে যোগ হয়েছে নতুনত্ব। অনেক প্রতিষ্ঠান ঈদ উপলক্ষে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ছাড়ও ঘোষণা করেছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, শহরের কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে মানুষ এখন প্রকৃতির কোলে সময় কাটাতে বেশি আগ্রহী। ফলে মৌলভীবাজারের চা-বাগানগুলোতে ঘুরে বেড়ানো, পাখির ডাক শোনা এবং সবুজের সমারোহে নিজেকে হারিয়ে ফেলার সুযোগ খুঁজছেন অনেকে। জেলায় শতাধিক চা-বাগান রয়েছে। এর মধ্যে লাউয়াছড়া উদ্যান, হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হামহাম জলপ্রপাত, বাইক্কা বিল, আনারস বাগান, লেবু বাগানসহ বিভিন্ন স্থান পর্যটকদের মন কাড়ছে। এছাড়া বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি কমপ্লেক্স, নীলকান্ত টি কেবিন, পৃথিমপাশা নবাব বাড়ি, সীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা, পারিজাত রিজার্ভ ফরেস্ট, বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক ইত্যাদি স্থানও দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয়।

জেলা সদরের আশেপাশেও রয়েছে অনেক দর্শনীয় জায়গা। মনু ব্যারেজ, মোগল আমলের শাহ সুজার মসজিদ, হজরত সৈয়দ মোস্তফা (রহ.)-এর মাজার শরীফ, ক্যামেলিয়া লেক, আদমপুর চা-বাগান, লাল টিলা, শঙ্কর টিলা, গরম টিলা, রাজনগর কমলা বাগান, বরথল বাগান লেকসহ নানা স্থান ঈদের ছুটিতে ভিড় জমাবে বলে আশা করা হচ্ছে। পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার্থে শতাধিক যানবাহন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। স্থানীয় ট্যুর গাইডরা বলছেন, বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও দেশি পর্যটকদের আগমন উল্লেখযোগ্য হতে পারে। অনেকে সপ্তাহান্তিক ছুটি কাজে লাগিয়ে একদিনের ট্যুরও করে ফিরে যাচ্ছেন।

জেলা পর্যটন সংশ্লিষ্ট সেলিম আহমেদ জানান, ঈদুল ফিতরের তুলনায় এবার ঈদুল আজহার ছুটিতে বুকিংয়ের পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো। গত ঈদে শেষ মুহূর্তে অনেক বুকিং বাতিল হয়েছিল। তবে এবার আগামী ২৮ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত বুকিং চলছে। শ্রীমঙ্গল এলাকায় সবচেয়ে বেশি রিসোর্ট রয়েছে। রাধানগর পর্যটন কল্যাণ সমিতির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজলী সামছুল বলেন, বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ বুকিং হয়েছে। ঈদের পরের দিন থেকে চাপ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। জেলায় শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে এবং নতুন নির্মাণও চলছে। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিশেষ করে ঢাকা-সিলেট রুটে নতুন পথ যুক্ত হলে পর্যটন আরও বৃদ্ধি পাবে।

গ্র্যান্ড গ্রুপের জিএম আরমান খান জানান, চা-বাগান ও প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে এ অঞ্চলে ট্যুরিস্টদের আনাগোনা সবসময়ই থাকে। এসএসসি পরীক্ষার কারণে কিছুটা প্রভাব পড়লেও ৫০ শতাংশ ডিসকাউন্ট অফারের কারণে ভালো সাড়া মিলছে। ব্যক্তিগত ট্যুর গাইড সৈয়দ রিফাত জামান বলেন, উচ্চবিত্ত পর্যটকদের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষও এখন প্রকৃতির কাছে ছুটে যাচ্ছেন। অনেকে বাইসাইকেল বা হেঁটে ঘুরে বেড়ান। খরচ কমাতে অনেকে রাত্রিযাপন না করে দিনে ফিরে যান।

নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের ওসি মো. কামরুল চৌধুরী জানান, জেলা পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবি সমন্বিতভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন সে লক্ষ্যে যানজট নিয়ন্ত্রণসহ সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আত্মীয়স্বজন নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্ক অবস্থানে থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

মৌলভীবাজারের পর্যটন শিল্প স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ছুটির সময়ে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, স্থানীয় কারিগরি পণ্য ও গাইড সার্ভিসের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়। এবারের ঈদুল আজহার ছুটি তাই পর্যটন ব্যবসায়ীদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। তবে বৃষ্টি ও সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারপরও সবাই আশাবাদী যে, এবারের ছুটিতে ভালো সাড়া মিলবে।

পর্যটকদের জন্য পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রকৃতি রক্ষায় প্লাস্টিক বর্জন, নির্ধারিত পথে চলাফেরা এবং স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিবেশকে সম্মান করা উচিত। মৌলভীবাজার শুধু চা-বাগানের জন্য নয়, এখানকার মানুষের আতিথেয়তা, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যও পর্যটকদের মুগ্ধ করে। ঈদের এই টানা ছুটিতে যারা প্রকৃতির কাছে ফিরতে চান, তাদের জন্য মৌলভীবাজার এক আদর্শ গন্তব্য।

এই ছুটিতে পর্যটন খাতের উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা, আধুনিক সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে মৌলভীবাজার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এখন শুধু অপেক্ষা সবুজের সমারোহে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার। পর্যটকদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত মৌলভীবাজারের প্রতিটি চা-বাগান, জলপ্রপাত ও হাওর।

প্রতিবেদক : আহাদ হোসেন খান

Read Previous

বেবিচকের ২৪ কর্মকর্তা পেলেন আইসিএও সনদ

Read Next

মালদ্বীপের গভীর গুহায় ইতালীয় ডুবুরিদের মরদেহ উদ্ধার, এক মালদ্বীপীয় উদ্ধারকারী নিহত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular