
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বাংলাদেশের অপার্থিব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, সিলেটের সবুজ চা-বাগান, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঝর্ণা ও সেন্ট মার্টিনের নীল জলরাশি — এসব সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যটন খাত এখনও তার পূর্ণ সম্ভাবনা ছুঁতে পারেনি।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পর্যটক আগমনের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার ৬৮৫ জন। একই সঙ্গে বিদেশি পর্যটকদের ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে ৪৪০ মিলিয়ন ডলারে, যা ২০২৩ সালের ৪৫৩ মিলিয়ন ডলার থেকে ১৩ মিলিয়ন ডলার কম।
২০২৫ অর্থবছরে (জুলাই ২০২৫ – জুন ২০২৬) পরিস্থিতিতে সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রাথমিক তথ্য ও অনুমান অনুসারে, বিদেশি পর্যটক আগমন ১২ থেকে ১৫ লাখের মধ্যে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের শেষার্ধে কক্সবাজার, সিলেট ও অন্যান্য গন্তব্যে হোটেল-রিসোর্টের অকুপেন্সি রেট ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উন্নতি। তবে এখনও অভ্যন্তরীণ পর্যটনই খাতের প্রধান চালিকাশক্তি। জাতীয় পর্যটন মাস্টার প্ল্যানের খসড়া চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে, যা ২০৪১ সাল নাগাদ ৫৫ লাখেরও বেশি বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরের মধ্যে মূল পার্থক্য
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটক আগমন ছিল প্রায় ৬.৩১ লাখ এবং আয় ৪৪০ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ অর্থবছরে আগমনের হারে ১০-২০ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। হোটেল-রিসোর্টের অকুপেন্সি রেটে উন্নতি হয়েছে, বিশেষ করে শীতকালীন মৌসুমে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসা, কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ডিজিটাল প্রচারের কারণে পর্যটকদের আস্থা কিছুটা বেড়েছে। তবে চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে — অবকাঠামোর দুর্বলতা, যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, জটিল ভিসা প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক মার্কেটিংয়ের ঘাটতি। পর্যটনের জিডিপিতে অবদান এখনও মাত্র ৩ শতাংশের কাছাকাছি, যেখানে বিশ্ব গড় ১০ শতাংশেরও বেশি।
হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিকদের নেওয়া উচিত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলোকে আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে হবে। প্রথমত, স্টাফদের প্রশিক্ষণ। আন্তর্জাতিক মানের হসপিটালিটি ট্রেনিং, ইংরেজি, চীনা, আরবি, জাপানি ভাষায় দক্ষতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। অতিথিদের সংস্কৃতি ও চাহিদা বুঝে সেবা প্রদানের দক্ষতা তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল উপস্থিতি শক্তিশালী করা। হোটেলগুলোর ওয়েবসাইটকে বহুভাষী করতে হবে, অনলাইন বুকিং সিস্টেম সহজ ও নিরাপদ করতে হবে। Booking.com, Expedia, Airbnb-এর মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করা দরকার।
তৃতীয়ত, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব অনুশীলন গ্রহণ। সোলার বিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ইকো-ফ্রেন্ডলি নির্মাণ পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। চতুর্থত, থিম-ভিত্তিক প্যাকেজ তৈরি। শুধু থাকা-খাওয়া নয়, ইকো ট্যুর, হেরিটেজ ওয়াক, কমিউনিটি হোমস্টে, ওয়াটার স্পোর্টস, সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা এবং লোকাল ক্রাফটের সঙ্গে যুক্ত প্যাকেজ দিতে হবে।
পঞ্চমত, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুবিধা জোরদার করা। সিসিটিভি, টুরিস্ট পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়, ইমার্জেন্সি মেডিকেল সাপোর্ট এবং হাইজিন স্ট্যান্ডার্ড নিশ্চিত করতে হবে। লোকাল অর্গানিক খাবার ও হ্যান্ডিক্রাফট প্রমোট করে পর্যটকদের স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে নতুন আধুনিক রিসোর্ট গড়ে তোলা সম্ভব।
সরকারের ভূমিকা: নেতৃত্বদানকারী অংশীদার
সরকারের ভূমিকা ছাড়া এই খাতের বড় অগ্রগতি সম্ভব নয়। প্রথমত, ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ। ই-ভিসা ও ভিসা অন অ্যারাইভালের পরিধি বাড়ানো দরকার, বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটকদের জন্য। দ্বিতীয়ত, অবকাঠামো উন্নয়ন। কক্সবাজার, সিলেট, সুন্দরবন ও পার্বত্য অঞ্চলের রাস্তা, বিমানবন্দর, রেল ও ফেরি সার্ভিসকে আধুনিক মানে উন্নীত করতে হবে।
তৃতীয়ত, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ। হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে আরও প্রাতিষ্ঠানিক কোর্স চালু করা, ট্যুর গাইডদের প্রশিক্ষণ এবং যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক মার্কেটিং জোরদার। ‘Beautiful Bangladesh’ ক্যাম্পেইনকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ট্রাভেল ইনফ্লুয়েন্সার ও আন্তর্জাতিক ট্যুরিজম ফেয়ারের মাধ্যমে আরও ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে।
পঞ্চমত, প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা। নতুন হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণে ট্যাক্স ছাড়, সহজ ঋণ, এক্সপোর্ট স্ট্যাটাস প্রদান এবং টুরিস্ট পুলিশকে আরও শক্তিশালী করা। পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর নিয়ম প্রয়োগ করে সাসটেইনেবল ট্যুরিজম নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় পর্যটন মাস্টার প্ল্যানে ১০টি ট্যুরিজম ক্লাস্টার গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে, যার জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন।
সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন
২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ অর্থবছরে পর্যটন খাতে সামান্য ইতিবাচক গতি দেখা গেলেও এটি এখনও যথেষ্ট নয়। হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিকদের আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল প্রচার ও টেকসই অনুশীলন গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে সরকারকে ভিসা সহজীকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, মার্কেটিং ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে শক্তিশালী নেতৃত্ব দিতে হবে।
যদি সরকারি ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে পর্যটন বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে। এতে বিদেশি মুদ্রা আয় বাড়বে, লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হবে এবং বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে একটি আকর্ষণীয় ও টেকসই পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ


