২৭/০৪/২০২৬
১৪ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের মাঝে বিতর্কিত বোয়িং কেনা: ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা কতটা যৌক্তিক?

বিমানে বোয়িং

বিমানে বোয়িং

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : দেশের অর্থনীতি যখন তীব্র টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত। কৃষকের সেচ পাম্প বন্ধ, যানবাহন চলাচল স্থবির, শিল্পকারখানায় উৎপাদন হ্রাস—এমন পরিস্থিতিতে সরকার সর্বস্তরে কৃচ্ছ্রসাধনের ঘোষণা দিয়েছে। অথচ একই সময়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে চলছে। এই কেনাকাটার আনুমানিক ব্যয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা পুরোপুরি ঋণের মাধ্যমে মেটানো হবে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টের অংশ হিসেবে এই চুক্তি এগিয়েছে বলে জানা যায়। আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, পাঁচ বছরের মধ্যে এই ১৪টি উড়োজাহাজ ডেলিভারি নেওয়া হবে। এর মধ্যে থাকছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স মডেলের বিমান।

সরকারের দাবি, এই কেনাকাটা বিমানের বহর সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক যাত্রী চাহিদা মেটানোর জন্য জরুরি। বর্তমানে বিমানের বহরে ২১টি উড়োজাহাজ রয়েছে, যার মধ্যে দুটি ভাড়ার মেয়াদ শেষে ফেরত যাবে। ভবিষ্যতে বহরকে ৪৭টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও এভিয়েশন বিশ্লেষকরা এই সিদ্ধান্তকে ‘অসময়ের বিলাসিতা’ বলে সমালোচনা করছেন। তাঁদের মতে, দেশ যখন আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাছে জরুরি ঋণ চাইছে, তখন এত বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ নতুন করে সুদের বোঝা বাড়াবে।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধির ধারা কমছে, বিনিয়োগ স্থবির, কর্মসংস্থান ধীরগতির এবং দারিদ্র্য বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ অব্যাহত। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম অস্থির হয়ে উঠেছে, যা আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সতর্ক করে বলেছে, বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে স্বল্পমেয়াদি ঋণের ঝুঁকি বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে ৩.৭ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা) বোয়িং ক্রয় রিজার্ভের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। ডাউন পেমেন্ট হিসেবে ৩-৩.৫ হাজার কোটি টাকা জোগাড় করাও বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পরিপত্রে যানবাহন, কম্পিউটার কেনা, বিদেশ ভ্রমণসহ ১১টি খাতে ব্যয় সীমিত করা হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি সংকটে কৃষি ও শিল্প ধুঁকছে, অথচ বিপুল ঋণ নিয়ে উড়োজাহাজ কেনা সরকারের মিতব্যয়িতা নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগের কেনা ১০টি বোয়িংয়ের পুরো টাকা এখনো পরিশোধ হয়নি। নতুন চুক্তিতে ২০ বছরে পরিশোধের কথা বলা হলেও সুদের হার ও ডলার-টাকার বিনিময় হারের ওঠানামায় বার্ষিক চাপ ২,৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও যন্ত্রাংশের খরচও বিপুল। বর্তমানে বিমানের মুনাফা ৮০০ কোটি টাকার নিচে।

সূত্র জানায়, এই সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং সম্ভাব্য ৩৫ শতাংশ রেসিপ্রোকাল শুল্ক এড়ানোর কৌশল রয়েছে। চুক্তির সঙ্গে ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি ও কৃষিপণ্য আমদানিও যুক্ত। সমালোচকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের আগে চাপমুক্ত হতে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা পরবর্তী সরকারের হাত বেঁধে দিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এককভাবে বোয়িংয়ের ওপর নির্ভর করলে পোশাক খাতে ইউরোপীয় বাজারে অগ্রাধিকার সুবিধা পাওয়া কঠিন হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এয়ারবাসের সঙ্গে এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা এখন অনিশ্চিত।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম মনে করেন, দূরপাল্লার বড় জেটের চেয়ে আঞ্চলিক রুটের জন্য ছোট উড়োজাহাজ বেশি প্রয়োজন। ড্রিমলাইনারের অপারেটিং খরচ আকাশছোঁয়া। তাঁর মতে, বিমানের সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রয়োজন ও সক্ষমতা থেকে আসা উচিত, না যে ওপর মহলের নির্দেশে। বিমানকে বাঁচাতে ব্যবস্থাপনায় পেশাদারি নিশ্চিত করতে হবে।

বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম বলেন, পরিচালনা পর্ষদের নীতিগত সিদ্ধান্তের পর চুক্তি সইয়ের আলোচনা চলছে। ডেলিভারি শুরু হতে পারে ২০৩১-৩২ সালে। আগের ১০টি বোয়িংয়ের চারটির ঋণ পরিশোধ হয়েছে, বাকি শেষ পর্যায়ে। নতুন কেনার দায় বিমান বহন করবে, সরকার শুধু গ্যারান্টি দেবে। সর্বনিম্ন সুদের ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হবে।

অর্থনীতিবিদরা সুপারিশ করছেন, চুক্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, আর্থিক মডেলিং করা এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন জরুরি। বিমানের ব্যবস্থাপনা সংস্কার, রুট অপ্টিমাইজেশন এবং প্রাইভেট সেক্টরের অংশীদারি ছাড়া ফ্লিট সম্প্রসারণ শুধু বোঝা বাড়াবে।

দেশের এই দুঃসময়ে বিলাসী কেনাকাটা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে। সরকারের উচিত জনকল্যাণমূলক খাতে অগ্রাধিকার দিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। অন্যথায় এই ধরনের সিদ্ধান্ত জাতীয় অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার

Read Previous

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যশোরে প্রথমবারের মতো সরকারি সফরে পৌঁছেছেন

Read Next

ঢাকায় শেনজেন দূতাবাসগুলোর সতর্কতা: ভিসা মিললেই নিয়ম ভাঙার সুযোগ নেই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular