
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ আজ যে রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছে, তার প্রভাব রাজধানীর বাতাসেই অনুভূত হচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আরও দুই আসামির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা হবে। এখানেই শুরু টানটান উত্তেজনা। নিরাপত্তা বাহিনী সকাল থেকেই শহরটাকে প্রায় ঘেরাও অবস্থায় রেখেছে।
ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ রায় দেবেন। সিদ্ধান্ত যাই হোক, আজকের দিনটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নেবে—এটা বলাই যায়।
আদালতপাড়ায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা
হাইকোর্ট এলাকার পুরো চত্বর যেন একটি আলাদা জোনে পরিণত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের চারপাশে ঘন নিরাপত্তা বলয়। গেটের সামনে সেনাবাহিনী দাঁড়িয়ে আছে, আর ভেতরে বাইরে পুলিশ, র্যাব এবং অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের ব্যস্ত দৌড়ঝাঁপ। সন্দেহজনক কাউকে ছাড় দিচ্ছে না তারা। দোয়েল চত্বর থেকে শিক্ষাভবন পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল বন্ধ। উদ্দেশ্য একটাই—রায় ঘিরে কোনো অস্থিরতা যাতে মাথা না তোলে।
শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতেও একই চিত্র। তল্লাশি চলছে, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। নিরাপত্তাকর্মীরা বলছে, সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে শুধু সাবধানতার জন্য, আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য নয়।
শহরের জীবনযাত্রা খোলা, কিন্তু সবাই সতর্ক
যদিও আদালতপাড়া উত্তেজনায় ভরপুর, শহরের অন্যান্য এলাকায় জীবনযাত্রা মোটামুটি স্বাভাবিক। অফিসগামীদের প্রবাহ আছে, গণপরিবহন চলছে, মেট্রোরেলও স্বাভাবিক গতিতে। যানজটও আছে, যেন আরেকটা সাধারণ দিন। কিন্তু বাস্তবতা একটু অন্যরকম—নাগরিকরা বুঝতে পারছেন, শহরটি আজ এক বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
রায় সরাসরি দেখার ব্যবস্থা
রায়ের গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার অনুষ্ঠানটিকে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভি এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্স সরাসরি সম্প্রচার করবে। ট্রাইব্যুনালের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজেও দেখা যাবে। পাশাপাশি ঢাকার কয়েকটি এলাকায় বড় পর্দায় লাইভ দেখানোর আয়োজন করেছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। ফলে রায়ের খবর মানুষ ঘরেই নয়, বাইরে থেকেও দেখতে পারবে।
মামলার দীর্ঘ পথচলা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ট্রাইব্যুনাল নতুনভাবে গঠিত হয়। পুনর্গঠনের পর প্রথম যে মামলাটি আসে, তা হলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দাখিল হওয়া বিবিধ মামলা।
পরে তদন্তে উঠে আসে আরও অনেক নাম, আরও অনেক অভিযোগ। গত বছরের অক্টোবর থেকে শুরু হয় বিচারকাজ। এরপর ধাপে ধাপে তদন্ত রিপোর্ট, প্রমাণপত্র ও সাক্ষ্য জমা দিতে থাকে রাষ্ট্রপক্ষ। মোট ৮ হাজার ৭০০ পৃষ্ঠার বেশি নথি জমা পড়ে ট্রাইব্যুনালে—যার মধ্যে প্রমাণাদি, শহীদদের তালিকা, জব্দতালিকা সবই আছে।
চলতি বছরের মার্চে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে মামলার আসামি করে ট্রাইব্যুনাল। পরে তিনি দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রের সাক্ষী হতে আবেদন করেন। ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করে, আর মামুন রাজসাক্ষী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেন।
কোন কোন অভিযোগ নিয়ে রায়
রাষ্ট্রপক্ষ হাসিনা-কামাল-মামুনের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ এনেছে। অভিযোগগুলো সংক্ষেপে হলো—
- ছাত্র-জনতার ওপর ‘পদ্ধতিগত ও ব্যাপক’ হামলার নির্দেশ ও দায়
- হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ
- রংপুরে ছাত্র আবু সাঈদের হত্যা
- চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যা
- আশুলিয়ায় ছয়জনকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা
রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, সবগুলো অভিযোগই প্রমাণিত। তারা সর্বোচ্চ শাস্তির প্রত্যাশা করছে। অন্যদিকে আসামিপক্ষ বলছে, অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
শেষ মুহূর্তের অপেক্ষা
গত ২৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষের সমাপনী যুক্তি উপস্থাপনের পর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা পাল্টা যুক্তি দেন। এরপর ট্রাইব্যুনাল রায়ের দিন ঘোষণা করে। শহরজুড়ে যে সতর্কতা দেখা যাচ্ছে, তা বলছে—সবাই অপেক্ষায় আছে, কিন্তু আশায়-আশঙ্কায় মিশে আছে সেই অপেক্ষা।
আজকের রায়ের পর রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনমানসে নতুন আলোচনা শুরু হবে নিশ্চিত। তবে এই মুহূর্তে রাজধানীর লক্ষ্য একটাই—দিনটি যেন শান্তিপূর্ণভাবে পার হয়ে যায়।



