০৬/০৫/২০২৬
২৩শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেবি অ্যান্ড চাইল্ড ট্যুরিজম: পরিবারকেন্দ্রিক পর্যটনের নতুন দিগন্ত, বাংলাদেশের সময় কি এসেছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বেবি অ্যান্ড চাইল্ড ট্যুরিজম বা শিশুকেন্দ্রিক পর্যটন হলো পর্যটন শিল্পের একটি বিশেষায়িত ও দ্রুত বিকশমান শাখা। এতে শিশু (বিশেষ করে বেবি থেকে ১২ বছর বয়সীদের) চাহিদা, নিরাপত্তা, বিনোদন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সাধারণ ফ্যামিলি ট্যুরিজমের চেয়ে এটি আরও গভীর ও পরিকল্পিত। এখানে পিতামাতা ও শিশুর যৌথ অভিজ্ঞতা (প্যারেন্ট-চাইল্ড ট্রাভেল) কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। শিশু-বান্ধব হোটেল, নিরাপদ প্লে-এরিয়া, বিশেষায়িত খাবার মেনু, শিশু চিকিৎসা সুবিধা, শিক্ষামূলক অ্যাকটিভিটি এবং সহজ ও নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা এর মূল উপাদান। এই ধরনের পর্যটন শুধু বিনোদন নয়, শিশুর সামগ্রিক বিকাশ, সাংস্কৃতিক জ্ঞানার্জন এবং পরিবারের আন্তঃসম্পর্ক মজবুত করার এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিশ্বব্যাপী এই খাত অভূতপূর্ব গতিতে বাড়ছে। ২০২৫ সালে প্যারেন্ট-চাইল্ড ট্রাভেল মার্কেটের আনুমানিক মূল্য ছিল ১৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন, ২০৩৪ সাল নাগাদ এটি ৩৬৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে, যার বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি হার (CAGR) প্রায় ৭.৯ শতাংশ। আধুনিক পিতামাতারা আর শুধু বিশ্রাম বা অ্যাডভেঞ্চার খুঁজছেন না; তাঁরা চান শিশুরা ভ্রমণের মাধ্যমে নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করুক, শিখুক এবং স্মৃতি গড়ুক। ফ্যামিলি ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনের সাম্প্রতিক জরিপ অনুসারে, প্রায় ৯২ শতাংশ অভিভাবক আগামী বছর শিশুদের সঙ্গে ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন। শিশুরা এখন ট্রিপ প্ল্যানিংয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠেছে, যাকে ‘কিডফ্লুয়েন্স’ (kidfluence) নামে অভিহিত করা হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন আয় বৃদ্ধি করছে। নিউজিল্যান্ডকে প্রায়শই বিশ্বের সবচেয়ে ফ্যামিলি-ফ্রেন্ডলি গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এখানে শিশুদের জন্য নিরাপদ অ্যাডভেঞ্চার পার্ক, ইন্টারেক্টিভ মিউজিয়াম এবং শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র ও ইন্টারেক্টিভ ফার্ম অভিজ্ঞতা শিশুদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো—নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও আইসল্যান্ড—শিশু নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনের জন্য বিখ্যাত। জাপানের পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও শিশু-বান্ধব পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বেবি ট্রাভেলারদের জন্য আদর্শ। স্পেনের থিম পার্ক, সুন্দর বিচ ও ফ্যামিলি-অরিয়েন্টেড রিসোর্টগুলো ইউরোপীয় পরিবারদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

এশিয়ায় থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী ফ্যামিলি প্যাকেজ, ওয়াটার পার্ক, সাংস্কৃতিক শো এবং শিশু-বান্ধব বিচ রিসোর্টের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক পরিবারকে আকৃষ্ট করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই লাক্সারি ফ্যামিলি এন্টারটেইনমেন্ট, ইনডোর থিম পার্ক ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুবিধার জন্য পরিচিত। এসব দেশে শিশুদের জন্য বিশেষ মেনু, ক্রেচ সার্ভিস, অনসাইট মেডিকেল সাপোর্ট এবং এডুকেশনাল ট্যুর নিশ্চিত করা হয়, যা পর্যটন আয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশে অবশ্য এই খাতে লক্ষণীয় কোনো ফোকাস এখনো দেখা যায় না। দেশের পর্যটন শিল্প এখনও মূলত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় স্থান ও সমুদ্র সৈকতের ওপর নির্ভরশীল। কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেটের চা বাগান, রাঙামাটি-বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চলসহ অনেক গন্তব্যই আকর্ষণীয়। কিন্তু শিশুদের জন্য বিশেষায়িত সুবিধা অত্যন্ত সীমিত। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ, মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবার অভাব, শিশু-বান্ধব টয়লেট, প্লে জোন, বেবি চেঞ্জিং রুম এবং জরুরি মেডিকেল সাপোর্টের অপ্রতুলতা প্রধান অন্তরায়। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের অধিকাংশ উদ্যোগ এখনো সাধারণ পর্যটক বা বড়দের দিকে ঝুঁকে আছে। ফলে অনেক মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবার শিশুদের সঙ্গে বিদেশমুখী হয়ে পড়ছে, যা দেশীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।

অথচ বাংলাদেশের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও উষ্ণ অতিথিপরায়ণতা শিশুকেন্দ্রিক পর্যটনের জন্য আদর্শ। সুন্দরবনকে ইকো-এডুকেশনাল ট্যুরের কেন্দ্রবিন্দু, কক্সবাজারকে ফ্যামিলি বিচ রিসোর্ট, সিলেটকে অ্যাডভেঞ্চার ও চা অভিজ্ঞতা কেন্দ্র এবং ঢাকা-চট্টগ্রামসহ শহরাঞ্চলে ইনডোর ফ্যামিলি এন্টারটেইনমেন্ট সেন্টার গড়ে তোলা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে শিশু-বান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ, প্রশিক্ষিত গাইড তৈরি, নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রচারণা চালালে এই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা আয় সম্ভব।

এছাড়া, স্থানীয় পর্যটন উন্নয়নের মাধ্যমে দেশীয় পরিবারগুলোর অর্থ দেশেই থাকবে এবং শিশুরা নিজ দেশের ঐতিহ্য ও প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হবে। এখনই সময় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, বেসরকারি পর্যটন সংস্থা ও হোটেল-রিসোর্ট মালিকদের একসঙ্গে কাজ করার। শিশুকেন্দ্রিক পলিসি তৈরি, বিশেষ প্যাকেজ চালু এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি উদীয়মান ফ্যামিলি ট্যুরিজম গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।

শিশুর হাসি ও কৌতূহল যখন পর্যটনের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তখন শুধু অর্থনৈতিক লাভ নয়, সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও সমৃদ্ধ হয়। বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু একটি পর্যটন খাত নয়, বরং একটি স্মার্ট ও টেকসই উন্নয়নের সুযোগ। সময় এসেছে এই সুযোগকে কাজে লাগানোর।

প্রতিবেদক: নাদিয়া আক্তার

Read Previous

বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাসও চায় বিমানের বহরে জায়গা

Read Next

জনতা ব্যাংকের নিলামে উঠছে গ্লোব জনকণ্ঠের ১৫ তলা ভবনসহ সম্পদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular