
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : পাহাড়ি ট্রেকিং একটি উত্তেজনাপূর্ণ অ্যাডভেঞ্চার, যা শারীরিক ও মানসিক সীমাকে চ্যালেঞ্জ করে। বাংলাদেশের বান্দরবান, সাজেক বা নেপাল-হিমালয়ের উচ্চতায় ট্রেক করতে গেলে শরীরের ওপর অসাধারণ চাপ পড়ে। উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে অক্সিজেন কমে যায়, শরীরের ক্যালরি চাহিদা বেড়ে যায় এবং অ্যাপেটাইট কমে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন ট্রেকারকে প্রতিদিন ৩০০০ থেকে ৫০০০ বা তারও বেশি ক্যালরি গ্রহণ করতে হয়, যা ট্রেকের দৈর্ঘ্য, উচ্চতা এবং ব্যক্তিগত ফিটনেসের ওপর নির্ভর করে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস না মানলে ডিহাইড্রেশন, পেশির ক্ষয়, ক্লান্তি, উচ্চতাজনিত অসুস্থতা (AMS) বা হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ট্রেকিংয়ের আগে, চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে পুষ্টির বিষয়ে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
ট্রেকিংয়ের জন্য খাদ্যতালিকায় সুষম অনুপাত রাখা উচিত। সাধারণত কার্বোহাইড্রেট ৪৫-৭০%, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ২৫-৪০% এবং প্রোটিন ১০-২০% হওয়া আদর্শ। উচ্চ উচ্চতায় কার্বোহাইড্রেটই প্রধান জ্বালানি, কারণ এটি অক্সিজেন কম থাকা অবস্থায় সহজে শক্তি জোগায়। জটিল কার্বস যেমন ওটস, পুরো শস্যের রুটি, চাল, আলু, পাস্তা, কুয়িনো বা বার্লি দীর্ঘস্থায়ী এনার্জি সরবরাহ করে। প্রতি ঘণ্টায় ৩০-৬০ গ্রাম কার্ব গ্রহণের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। হিমালয়ান ট্রেকিংয়ে অনেকে ৬০-৭০% কার্ব-সমৃদ্ধ খাবারের ওপর জোর দেন।
প্রোটিন পেশি মেরামত ও পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে। প্রতি কেজি শরীরের ওজন অনুযায়ী ১.৪-২.০ গ্রাম প্রোটিন লক্ষ্য রাখুন। উৎস হিসেবে নাটস, বাদাম, শুকনো মাংস (জের্কি), ডিম, ডাল, ছোলা, দুগ্ধজাত দ্রব্য বা সয়া প্রোডাক্ট ভালো। উচ্চতায় অ্যাপেটাইট কমে যাওয়ায় ছোট ছোট করে প্রোটিন-সমৃদ্ধ স্ন্যাকস খাওয়া জরুরি। স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ক্যালরি ঘনত্ব বাড়ায় এবং শরীরকে উষ্ণ রাখে। নাট বাটার, অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো, ডার্ক চকলেট বা নারকেল তেল এ ক্ষেত্রে উপকারী।
ট্রেকের আগে প্রস্তুতি
ট্রেক শুরুর ২-৩ দিন আগে থেকে কার্ব-লোডিং করুন। প্রচুর কমপ্লেক্স কার্বস যেমন ওটমিল, বাদামী চাল, ফল এবং সবজি খান যাতে গ্লাইকোজেন স্টোর পূর্ণ হয়। সকালের নাশতায় ওটসের সাথে নাটস, কলা, মধু এবং দই মিশিয়ে খান। এতে প্রোটিন ও কার্বের ভালো মিশ্রণ হয়। ট্রেকের দিন সকালে হালকা কিন্তু পুষ্টিকর খাবার খান—ডিম, চাপাতি, ফল বা গ্রানোলা। ভারী ফ্যাটি খাবার এড়িয়ে চলুন যাতে হজমের সমস্যা না হয়।
ট্রেক চলাকালীন খাবার
ট্রেকিংয়ের সময় “খাওয়া ছোট ছোট, ঘন ঘন” নীতি মেনে চলুন। প্রতি ৩০-৬০ মিনিটে স্ন্যাকস খান। ট্রেইল মিক্স (বাদাম-শুকনো ফলের মিশ্রণ), এনার্জি বার, খেজুর, কিশমিশ, চিঁড়া-গুড়, গ্রানোলা, শুকনো আলু বা এনার্জি জেল সবসময় সঙ্গে রাখুন। বাংলাদেশি ট্রেকাররা চিঁড়া, মুড়ি, গুড়, শুকনো নারকেল বা ছোলা ভাজা সহজে প্যাক করে নিতে পারেন। হিমালয়ান ট্রেকে ডাল-ভাত, থুকপা, মোমো বা নুডলস জনপ্রিয়, কারণ এগুলো কার্ব ও প্রোটিনের ভালো উৎস।
হাইড্রেশন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন ৩-৫ লিটার পানি পান করুন। উচ্চতায় শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে ডিহাইড্রেশন ঝুঁকি বাড়ে। ORS, ইলেকট্রোলাইট ট্যাবলেট বা লেবু-লবণের শরবত মিশিয়ে পান করুন। আদা চা বা লেবু চা হজমে সাহায্য করে এবং উচ্চতাজনিত অস্বস্তি কমায়।
যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন এবং কারণ
কিছু খাবার ট্রেকিংয়ে বিপজ্জনক হতে পারে। ভারী, গ্রিসি, ফ্রাই করা খাবার (বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিপস, অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার) এড়িয়ে চলুন। এগুলো হজম করতে শরীরের অতিরিক্ত এনার্জি লাগে, পেট ফাঁপা বা ডায়রিয়া হতে পারে। উচ্চ ফাইবারযুক্ত কাঁচা সবজি বা শুকনো ফল (যেমন প্রুনস) গ্যাস্ট্রিক সমস্যা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে উচ্চতায় যেখানে হজমশক্তি কমে যায়।
অতিরিক্ত চিনি বা প্রসেসড সুগারযুক্ত আইটেম (ক্যান্ডি, সফট ড্রিংকস, অতিরিক্ত মিষ্টি এনার্জি ড্রিংক) দ্রুত এনার্জি দিলেও পরে শক্তির ধস (সুগার ক্র্যাশ) ঘটায়। অ্যালকোহল একেবারে এড়িয়ে চলুন—এটি ডিহাইড্রেট করে এবং উচ্চতাজনিত ঝুঁকি বাড়ায়। অতিরিক্ত ক্যাফেইনও ঘুমের সমস্যা এবং ডিহাইড্রেশন ঘটাতে পারে। সহজে নষ্ট হয় এমন পারিশেবল খাবার (তাজা মাংস, দুধ, সালাদ, মেয়োনিজযুক্ত স্যান্ডউইচ) দূরবর্তী এলাকায় ফুড পয়জনিংয়ের ঝুঁকি তৈরি করে। সুগার অ্যালকোহলযুক্ত প্রোডাক্টস (সরবিটলযুক্ত চুইংগাম বা ক্যান্ডি) পেট খারাপ করতে পারে।
উচ্চতায় অ্যাপেটাইট কমে যাওয়ার কারণ হলো হাইপোক্সিয়া—শরীর অক্সিজেন বাঁচাতে হজম প্রক্রিয়া ধীর করে দেয়। তাই জোর করে না খেয়ে ঘন ঘন ছোট অংশে খান। পোস্ট-ট্রেক রিকভারিতে প্রোটিন-সমৃদ্ধ খাবার (ডিম, দই, ডাল) এবং কার্বস খান যাতে পেশি পুনর্গঠন হয়।
উদাহরণ ডেইলি মিল প্ল্যান
সকাল: ওটস/পরিজ + নাটস + ফল।
ট্রেইলে: প্রতি ঘণ্টায় ট্রেইল মিক্স বা এনার্জি বার।
দুপুর: ডাল-ভাত/নুডলস + সবজি।
বিকেল: খেজুর + বাদাম।
রাত: হালকা স্যুপ/থুকপা + প্রোটিন।
পানি: সারাদিনে পর্যাপ্ত।
ট্রেকিংয়ে সফলতা শুধু ফিটনেস নয়, সঠিক পুষ্টি ও হাইড্রেশনের ওপরও নির্ভর করে। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য অবস্থা বিবেচনা করে ডাক্তার বা নিউট্রিশনিস্টের পরামর্শ নিন। সচেতন খাদ্যাভ্যাস মেনে চললে পাহাড় জয় করা হবে নিরাপদ, আনন্দময় এবং স্মরণীয়। আপনার পরবর্তী ট্রেকে সঠিক খাবার প্যাক করে বেরিয়ে পড়ুন—পাহাড় আপনাকে ডাকছে!
প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার


