
আলিকদম
সম্পাদক: শিরিন আক্তার
বান্দরবানের দক্ষিণাঞ্চলে, যেখানে সবুজ পাহাড়ের ঢেউ একের পর এক আকাশ ছুঁয়ে যায়, মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলে আর ঝর্ণার গর্জন প্রকৃতির সুর তুলে, সেখানে অবস্থিত আলীকদম উপজেলা। এ যেন এক শিল্পীর স্বপ্নের ক্যানভাস, যেখানে প্রকৃতি নিজ হাতে তুলি চালিয়ে এঁকেছে অপরূপ এক ছবি। ঘন বনের গাঢ় সবুজ, পাহাড়ের নীলাভ ছায়া, নদীর রূপালি ধারা আর সূর্যাস্তের লালিমা মিলে যেন এক অলৌকিক দৃশ্য সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের এই লুকানো রত্ন শুধু একটি প্রশাসনিক এলাকা নয়, বরং অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়, প্রকৃতিপ্রেমী ও সাংস্কৃতিক অনুসন্ধিৎসু ভ্রমণকারীদের জন্য এক অবিস্মরণীয় গন্তব্য। আলীকদমের প্রতিটি পথ, প্রতিটি কোণা যেন কথা বলে—প্রাচীন ইতিহাসের ফিসফিসানি, জাতিগত বৈচিত্র্যের সুর আর প্রকৃতির অফুরন্ত সৌন্দর্যের আহ্বান।
আলীকদম উপজেলার আয়তন ৮৮৫.৭৮ বর্গকিলোমিটার। এটি বান্দরবান জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা। ভৌগোলিকভাবে এর অবস্থান ২১°২১´ থেকে ২১°৫০´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২°১৫´ থেকে ৯২°৩৪´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। বান্দরবান জেলা সদর থেকে প্রায় ১১১ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। উত্তরে লামা উপজেলা, দক্ষিণে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য, পূর্বে থানচি উপজেলা এবং পশ্চিমে লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা দিয়ে ঘেরা এই অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সমতল হলেও পাহাড়ি বৈশিষ্ট্যে ভরপুর। থাইকিয়াং তাং, রুরাং তাং, সারা তাংসহ বিভিন্ন পাহাড় এখানকার ল্যান্ডস্কেপকে অনন্য করে তুলেছে। মাতামুহুরী নদী এখানকার প্রাণ, যা সাপের মতো কেঁকড়ে চলেছে পাহাড়ের পাদদেশ ঘিরে, ফসলের খেতকে সিক্ত করে এবং পর্যটকদের মনকে মুগ্ধ করে।
নামকরণের পেছনে রয়েছে নানা কিংবদন্তি। অনেকের মতে, ‘আলোহক্যডং’ থেকে এসেছে আলীকদম। বোমাং সার্কেল চীফের পুরনো নথি ও ১৯৬৩ সালের মানচিত্রে এই নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। আরেকটি জনপ্রিয় ধারণা, এখানে ‘আলীর পাহাড়’ নামে একটি পাহাড় আছে, যার সাথে মিলে নাম হয়েছে আলীকদম। কথিত আছে, ৩৬০ আউলিয়ার একজন সাধক আলী এ অঞ্চলে এসেছিলেন। তার পদধূলিতে ধন্য হয়ে এলাকার নামকরণ। ইতিহাস বলে, নবম শতাব্দী থেকে এ অঞ্চল আরাকানি শাসনের অধীনে ছিল। প্রাচীন ইটভাটা, পুরনো পুকুর ও আলীর সুড়ঙ্গ এখানকার ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে। ১৯৯৯ সালে গবেষক আতিকুর রহমানসহ স্থানীয়রা নয়াপাড়ায় সুলতানী আমলের ইট আবিষ্কার করেন। ১৯৭৬ সালে থানা গঠিত হয় এবং ১৯৮৩ সালে উপজেলায় রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে চারটি ইউনিয়ন: আলীকদম সদর, চৈক্ষ্যং, কুরুকপাতা ও নয়াপাড়া।
২০২২ সালের আদমশুমারি অনুসারে আলীকদমের জনসংখ্যা ৬৩,৭৯৯ জন। জনঘনত্ব মাত্র ৭২ জন প্রতি বর্গকিলোমিটার—বাংলাদেশের অন্যতম কম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। পুরুষ ৩৩,৩১৫ এবং নারী ৩০,৪৮৪ জন। সাক্ষরতার হার প্রায় ৫৭ শতাংশ। ধর্মীয় বৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতো: মুসলিম ৫৪.৭১%, বৌদ্ধ ৩০.৫৪%, খ্রিস্টান ৬.৫১%, হিন্দু ৩.০৩% এবং অন্যান্য। জাতিগতভাবে বাঙালি ৬০.৬%, ম্রো (মুরং) ২৩.৮%, মারমা ৬.০৫%, ত্রিপুরা ৫.৪১%, তঞ্চঙ্গ্যাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাস। এই বৈচিত্র্য আলীকদমকে সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ করেছে। বৌদ্ধ বিহার, মসজিদ, গির্জা পাশাপাশি অবস্থান করে। ম্রো, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান, হস্তশিল্প, জুম চাষ ও জীবনযাত্রা পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। জুম চাষ, ধান, বিভিন্ন ফলমূল ও বনজ সম্পদ প্রধান আয়ের উৎস। পর্যটন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে নতুন গতি দিচ্ছে।
পর্যটন আকর্ষণ: প্রকৃতির অপরূপ উপহার
আলীকদমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান ‘আলীর গুহা’ বা ‘আলীর সুড়ঙ্গ’। পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই সুড়ঙ্গ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। প্রায় ১৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই গুহা থেকে দিনের আলোয় মহেশখালী দ্বীপ ও বঙ্গোপসাগরের আভাস মেলে বলে কথিত। পথ পিচ্ছিল ও চ্যালেঞ্জিং, তাই শীতকাল সবচেয়ে উপযুক্ত।
মারায়ং তং বা মারায়ান ডং (১৬৪০ ফুট) আরেক অসাধারণ গন্তব্য। পাহাড়চূড়ায় বিশাল বুদ্ধমূর্তি আকাশ ছুঁয়ে আছে। চারপাশে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ পাহাড়ের সারি, নিচে আঁকাবাঁকা মাতামুহুরী নদী ও সোনালি ফসলের খেত—দৃশ্য যেন ক্যামেরায় ধরে রাখার মতো নয়, অন্তরে গেঁথে রাখার মতো। ম্রো, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসতি এই সৌন্দর্যকে আরও জীবন্ত করে।
দামতুয়া ঝর্ণা (তুক আ দামতুয়া বা লামোনই) প্রকৃতিরআরেক রত্ন। ঘন জঙ্গলের ভেতর ৭-৮ কিলোমিটার ট্রেকিং করে পৌঁছাতে হয়। ঝর্ণার ঝরনা থেকে ছিটকে ওঠা পানির ফোঁটা, চারপাশের সবুজ বন ও পাথরের ওপর নেমে আসা সাদা ফেনা—যেন শিল্পীর তুলির সবচেয়ে সুন্দর স্ট্রোক। শীল বুনিয়া ঝর্ণাসহ আরও কয়েকটি ঝর্ণা আছে।
ডিম পাহাড়ের রাস্তা (আলীকদম-থানচি সড়ক) বাংলাদেশের অন্যতম উঁচু মোটরযোগ্য রাস্তা। এখান থেকে চারপাশের দৃশ্য অবিশ্বাস্য। সকালের কুয়াশা, দুপুরের রোদ আর সন্ধ্যার আলোয় এই রাস্তা ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে।
জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি
আলীকদমের মানুষ প্রকৃতির সাথে নিবিড় সম্পর্কে বাস করেন। বাঁশের ঘর, জুম চাষ, ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও উৎসবগুলোতে তাদের সরলতা ও আন্তরিকতা ফুটে ওঠে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর উৎসবে নাচ-গান, বাদ্যযন্ত্র ও খাবার পর্যটকদের আকর্ষণ করে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন চলছে, তবে আরও অনেক কিছু করার আছে।
পর্যটনের সম্ভাবনা ও টেকসই উন্নয়ন
আলীকদমের পর্যটন সম্ভাবনা অপরিসীম। ইকো-ট্যুরিজম, হাইকিং, কালচারাল ট্যুর ও ক্যাম্পিংয়ের জন্য আদর্শ। তবে টেকসই উন্নয়ন জরুরি—প্রকৃতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। রাস্তাঘাট, থাকার ব্যবস্থা ও সচেতনতা বৃদ্ধি এখানকার ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করবে।
যাতায়াত ও পরামর্শ
বান্দরবান থেকে জিপ বা বাসে আলীকদম যাওয়া যায়। থাকার জন্য স্থানীয় গেস্টহাউজ, কটেজ ও হোটেল আছে। স্থানীয় গাইড নিয়ে ট্রেক করা নিরাপদ। অক্টোবর থেকে মার্চ শীতকাল সেরা সময়। বর্ষায় ঝুঁকি বেশি।
আলীকদম শুধু একটি জায়গা নয়—এ এক অনুভূতি। যেখানে শিল্পীর আঁকা ক্যানভাসে প্রকৃতি প্রতিদিন নতুন রং মাখে। সকালের কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়, ঝর্ণার গর্জন, সূর্যাস্তের লালিমা আর রাতের তারাভরা আকাশ মনকে শান্ত করে, আত্মাকে নতুন করে জাগায়। বাংলাদেশের এই লুকানো রত্নকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার সময় এসেছে। যারা প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে চান, আলীকদম অপেক্ষায় আছে তাদের জন্য।



