৩০/০৪/২০২৬
১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পর্তুগালের পর্যটন খাতে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাব: প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ বাড়ছে

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : পর্তুগালের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি পর্যটন খাত চলতি ২০২৬ সালের পর্যটন মৌসুমের শুরুতেই অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক আকাশপথে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইউরোপের এই জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে। দুবাই, দোহা ও আবুধাবির মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাবগুলোতে ফ্লাইট বাতিল, সময়সূচি পরিবর্তন এবং নিরাপত্তা শঙ্কায় উত্তর আমেরিকা ও এশিয়া থেকে আসা পর্যটকদের বুকিং উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল (WTTC) এর তথ্য অনুসারে, মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের আন্তর্জাতিক ট্রানজিট ট্রাফিকের প্রায় ১৪ শতাংশ পরিচালনা করে। এই অঞ্চলের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় বিমান ভাড়া বেড়েছে এবং পর্যটকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনেকে শেষ মুহূর্তে ট্রিপ বাতিল করছেন বা বিকল্প গন্তব্য খুঁজছেন। যদিও সামগ্রিকভাবে স্পেন ও পর্তুগাল কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প গন্তব্য হিসেবে কিছু বুকিং বৃদ্ধি পেয়েছে, তবু লিসবন, আলগার্ভ এবং অন্যান্য অঞ্চলে প্রবাসী ব্যবসায়ীদের জন্য পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।

পর্তুগালে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী রেস্তোরাঁ, স্যুভেনির শপ, এয়ারবিএনবি আবাসন এবং ট্রান্সফার সার্ভিসের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের অনেকের আয়ই পর্যটন মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল। এবারের মৌসুমের শুরুতে প্রত্যাশিত ভিড় না হওয়ায় তাদের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

লিসবনে দীর্ঘদিন ধরে রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনা করা প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রতি বছর এই সময়ে আমাদের রেস্তোরাঁয় পর্যটকদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হতো। কিন্তু এবার সেই তুলনায় অনেক কম মানুষ আসছে। যারা আসছেন, তারাও খরচ কমিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। ফলে দৈনিক আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে পুরো মৌসুমই চাপের মধ্যে কাটাতে হবে।”

অন্যদিকে, পর্তুগালের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র আলগার্ভ অঞ্চলে হোটেল ও আবাসন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা কামরুল হাসান জানান, “গত বছরের তুলনায় এবার আগাম বুকিং ২০-৩০ শতাংশ কমেছে। অনেক কক্ষ এখনো খালি পড়ে আছে। উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার পর্যটকরা ট্রানজিট সমস্যার কারণে শেষ মুহূর্তে ট্রিপ বাতিল করছেন। ইউরোপের স্থানীয় পর্যটকরাও সাশ্রয়ী অপশন খুঁজছেন। যদি পরিস্থিতি না বদলায়, তাহলে বড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।”

পর্তুগালের অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবলদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, এই খাত দেশটির জিডিপির প্রায় ১২ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত অবদান রাখে, যা লক্ষাধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় এবং ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক না হয়, তাহলে পর্যটন খাতে মন্দা দেখা দিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতি এবং প্রবাসী কর্মীদের কর্মসংস্থানের ওপর।

এদিকে, পর্তুগাল সরকার পর্যটন খাতকে চাঙ্গা করতে নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ এবং আক্রমণাত্মক প্রচারণা চালানোর পরিকল্পনা করছে। লিসবন ও আলগার্ভের বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হলে পর্যটক প্রবাহ আবার বাড়বে। তবে মৌসুমের শুরুতে যে ধাক্কা লেগেছে, তা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে বছরজুড়ে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে বলে মনে করছেন অনেকে।

প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা আরও বলছেন, বিমান ভাড়া বৃদ্ধির কারণে তাদের অনেকেই বাংলাদেশে পরিবারের সঙ্গে যাতায়াত করতে গিয়ে অতিরিক্ত চাপে পড়েছেন। এই পরিস্থিতিতে তারা পর্তুগাল সরকারের কাছে পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ছোট-মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ সহায়তা চেয়েছেন।

সার্বিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু পর্তুগালের অর্থনীতিকেই প্রভাবিত করছে না, বরং এখানে বসবাসরত হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশির জীবিকার ওপরও ছায়া ফেলেছে। পর্যটন খাতের স্থিতিশীলতা ফিরে এলে তবেই এই চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বর্তমান অনিশ্চয়তার মধ্যে ব্যবসায়ীরা সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

Read Previous

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বোয়িংয়ের মধ্যে ঐতিহাসিক ১৪টি উড়োজাহাজ ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষর আজ

Read Next

৬ মে থেকে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হচ্ছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular